গর্ভবতী মা ও শিশুদের খাদ্য তালিকায় কেনো মাছ থাকা অপরিহার্য ? – bnewsbd.com

স্বাস্থ্য-চিকিৎসা

নিজস্ব প্রতিনিধি, বিনিউজবিডি.ডটকম :

ভোরের ডাক ডেস্ক : একজন সুস্থ মা-ই জন্ম দিতে পারেন একটি সুস্থ শিশু। আর তাই মা ও শিশু উভয়ের কথা চিন্তা করে, গর্ভধারণ এর পূর্ব হতেই এবং গর্ভধারণ এর প্রথম দিন থেকেই মায়ের স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে হবে। কারণ মায়ের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির উপরই নির্ভর করে অনাগত সন্তানের সুস্বাস্থ্য। তাই গর্ভবতী মাকে  দিতে হবে পর্যাপ্ত, পুষ্টিকর ও সুষম খাবার । গর্ভধারণের পর অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় মা-শিশুর ওজন বাড়ছে ঠিকঠাক, কিন্তু রয়ে যায় বিভিন্ন পুষ্টির ঘাটতি। এরকম যেন না হয় সেজন্যে মায়ের দৈনন্দিন খাবারের পুষ্টিমান  নিশ্চিত করতে হবে।   

শরীরের প্রয়োজনীয় শক্তি বা ক্যালরির উৎস হিসেবে শুধু ভাত বা শর্করাজাতীয় খাবার খেলেই হবে না, প্রোটিন বা আমিষ জাতীয় খাবার পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি শাক-সবজি এবং ফলমূলও থাকা চাই। সাধারণভাবে গর্ভকালীন মোট ক্যালরির এক-চতুর্থাংশ প্রোটিন থেকে নিতে হয়। কারণ শিশুর দেহের গঠন ও বৃদ্ধিতে প্রোটিনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিক অবস্থার থেকে বেশি পরিমাণের প্রোটিন গ্রহণ করতে হয় । কারণ, গর্ভের শিশুর  মস্তিষ্ক ও নতুন টিস্যু তৈরিতে, কোষকলার বৃদ্ধিতে প্রোটিন সাহায্য করে। 

বিভিন্ন মাছ প্রোটিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস এবং পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সমৃদ্ধ একটি খাবার। এসকল মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট একজন গর্ভবতী নারীর গর্ভে একটি সুস্থ ভ্রুণ গঠনের জন্য প্রয়োজন। তাই প্রতিদিনের প্রোটিনের চাহিদা পূরণে মাংস, দুধ, ডিম, ডাল এসব প্রোটিন জাতীয় খাবারের পাশাপাশি মাছকে গুরুত্ব দিতে হবে । FDA (ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) এবং EPA (এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি)-এর মত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি ২ থেকে ৩ টুকরো ছোট- বড় মাছ মা-এর দৈনিক খাবারে রাখার পরামর্শ দিয়ে থাকে। কারণ এসময়ে প্রাণিজ উৎস থেকে পাওয়া প্রোটিন নেয়া ভালো কারণ দেহে এর  জৈবিক শোষণের হার অনেক বেশি থাকায় খুব দ্রুত এবং সহজেই শোষিত হয়ে কাজ করতে পারে। 

তবে গর্ভকালীন সময়ে আমাদের দেশে মায়েদের মাছের ব্যাপারে বিভিন্ন ভ্রান্ত ধারণা দেওয়া হয়। যেমন মৃগেল মাছ খেলে শিশুর মৃগী রোগ হয়, বোয়াল মাছ খেলে সন্তানের চোয়াল বড় হয়, শিং বা শোল মাছ খেলে সন্তানের দেহ সর্পাকৃতির হয় ইত্যাদি অগণিত ভ্রান্ত ধারণা আছে-যা শুধু ভ্রান্তই। এসকল ভ্রান্ত ধারণা হবু মায়ের অপুষ্টিরও একটি বড় কারণ। 

গর্ভবতী মা ও শিশুদের খাদ্য তালিকায় কেনো মাছ থাকা অপরিহার্য ?মনে রাখতে হবে সব  ধরনের মাছ-ই  প্রোটিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। মাছ হল চর্বিহীন প্রোটিনের একটি  গুরুত্ত¡পূর্ণ উৎস। মাছের অপরিহার্য অ্যামাইনো অ্যাসিড গর্ভস্থ ভ্রুণের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। তবে মাছে প্রোটিন ছাড়াও অনেক গুরুত্বপূর্ণ অনুপুষ্টি বা মাইক্রোনিউট্রিয়ন্টে সমৃদ্ধ উপাদান থাকে। যেমন: ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও ভিটামিন ‘ডি’ থাকে যার অভাবে গর্ভাবস্থায়  অস্টিওম্যালেসিয়াম নামের অস্থি বা হাড়ের রোগ দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া আয়োডিনযুক্ত খাবার যেমন আকারে ছোট সামুদ্রিক মাছ গর্ভবতী মায়ের খাদ্যে থাকা উচিত। কারণ আয়োডিন শিশুর বুদ্ধি বা মস্তিষ্কের বর্ধনের জন্য খুব-ই জরুরি। এছাড়াও সামুদ্রিক মাছের মধ্যে অপরিহার্য ফ্যাটি অ্যাসিড- ওমেগা-৩ ও Eicosapentaenoic Acid (EPA) and Docosahexaenoic Acid (DHA) উপস্থিত থাকে, যেগুলো অন্যান্য খাদ্যে খুঁজে পাওয়া দুরূহ কিন্তু শিশুর মস্তিষ্ক ও দৃষ্টিশক্তির বিকাশের জন্য এগুলো খুবই জরুরি, দেশীয় ছোটমাছ যেমনঃ মলা, ঢেলা, দারকিনা ইত্যাদি মাছও আমিষসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় অনুপুষ্টির চাহিদা পূরণ করে গর্ভবতী নারী ও গর্ভস্থ শিশুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মনে রাখা প্রয়োজন, দাম নির্বিশেষে গর্ভাবস্থায় যেকোন ধরনের মাছই মা ও গর্ভস্থ শিশুর জন্য উপকারী। 

তবে, মাছ যেন তাজা হয় সে ব্যাপারটিকে নিশ্চিত করার চেস্টা করতে হবে । যেসব এলাকায় শিল্প-কারখানা বা পানিতে মার্কারি  থাকার সম্ভাবনা বেশি সেখানকার মাছ এড়িয়ে চলতে পারলে ভালো। । শুধু গর্ভকালীন সময়েই নয়, জন্মের পর প্রথম ৫ বছর শিশুদের ওজন ও শরীর খুব দ্রুত বাড়ে। শরীরের এ দ্রুত বৃদ্ধির জন্য প্রোটিন জাতীয় খাবারের প্রয়োজন অত্যধিক। এর অভাবে শিশুদের শরীরের বৃদ্ধি/উচ্চতা ব্যাহত হয়, শরীর খর্বাকৃতির হয়ে যায় এবং শরীরের ওজন কমে যায়। এ অভাব ক্রমাগত চলতে থাকলে শিশুদের কোয়াশিয়রকর এবং ম্যারাসমাস নামক মারাত্মক রোগ হতে পারে।  

আমার বাচ্চা মাছ খেতে চায় না, সব মায়েদের একটি সাধারণ অভিযোগ। । তাই সব মায়েদের জন্য এখানে  মাছের ৩ টি সুস্বাদু ও মজাদার রেসিপি  দেয়া হল, যা শিশুরা খুব পছন্দ করে খেয়ে থাকে  

মুচমুচে কাচকি মাছের চপ/ কাটলেট – 

উপকরণ-  কাচকি মাছ, চালের গুঁড়া, আলু ও বিভিন্ন রঙের  সবজি , পেঁয়াজ, ধনেপাতা, আদা-রসুন বাটা,  গরম মসলা, স্বাস্থ্যকর তেল।

প্রস্তুত প্রণালী- 

–     কাচকি মাছ পরিষ্কার করে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিয়ে সামান্য লবণ, পেয়াজ বাটা ও আদা-রসুন বাটা ও জল দিয়ে সেদ্ধ করে নিতে হবে। 

–     এবার আলু ধুয়ে সেদ্ধ করে ভালোভাবে চটকে নিন এবং সবজিগুলো (পরিমাণে কম) ধুয়ে ছোটো টুকরো করে কেটে সেদ্ধ করে নিন।

–      এবার সেদ্ধ মাছগুলোর সাথে  কুচিয়ে কাটা পেঁয়াজ, সামান্য মরিচ, ধনে পাতা, গরম মসলা , চটকানো আলু, সেদ্ধ  সবজি  ও চালের গুঁড়া  এবং স্বাদ মতো লবণ দিয়ে হালকাভাবে মেখে নিন।  

–     এবার ছোটো ছোটো চপ/ কাটলেট তৈরি করে গরম অলিভ অয়েল/ সরিষা তেলে অল্প আঁচে ভেজে নিন, হালকা বাদামী হলে নামিয়ে নিন। 

অন্যান্য যেকোনো মাছ দিয়েও এটি তৈরি করা যাবে। এ খাবারটি শিশুর দৈনিক মোট ক্যালরির ৫৩%  কার্বোহাইড্রেট, ১৩% প্রোটিন  ও ৩৪% ফ্যাটের চাহিদা মেটাবে। এ খাবারটি শিশুকে নাস্তায় বা ভাত উভয়ের সাথে দেয়া যেতে পারে। 

ফ্রাইড প্রন বল-

উপকরণ-  মাঝারি সাইজের চিংড়ি, পাউরুটি (ঘরে তৈরি হলে ভালো),  ডিম , ব্রেডকাম,  টমাটো সস, শসা, সয়া সস, লবণ, গোলমরিচ, আদা বাটা, স্বাস্থ্যকর তেল। 

প্রস্তুত প্রণালী

–    মাঝারি সাইজের চিংড়ি  কেটে ভালোভাবে ধুয়ে নিয়ে, সয়াসস, আদা বাটা , সামান্য মরিচ বাটা, স্বাদ মতো লবণ, সামান্য সাদা গোলমরিচ দিয়ে মেরিনেট করে  ৩০ মিনিট রাখুন।

–     এবার পাউরুটিগুলো পাশের অংশ বাদ দিয়ে কেটে ফেলুন, ২টি ডিম ফেটে নিন, ব্রেডকাম রেডি করে রাখুন

–     এবার চিংড়িগুলোকে কোনো স্বাস্থ্যকর তেলে হালকা ভেজে নিন। 

–   এবার ১ পিস  পাউরুটি পানিতে হালকাভাবে ভিজিয়ে নিয়ে এতে চিংড়ি মাছটি ভরে দিয়ে, হাত দিয়ে চেপে চেপে গোলাকার করে ফেলুন। (চিংড়ি মাছের পরিবর্তে অন্য মাছও দেয়া যেতে পারে) 

–    এবার চিংড়ির বলটিকে ডিমে ডুবিয়ে, ব্রেডকামে গরিয়ে নিন। সবগুলো তৈরি হয়ে গেলে ৩০ মিনিট ফ্রিজে রেখে তারপর ডুবো তেলে গাঢ় বাদামি করে ভেজে নিন।

খাবারটি শিশুকে টমাটো সস , শসা কুঁচি এবং ১ গ্লাস লেবুর শরবত এর সাথে গরম গরম পরিবেশন করুন। এই নাস্তাটিতে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট, ও ভিটামিন-মিনারেল থাকায় এটি একটি সুষম খাবার । 

মজাদার ফিশ ফিঙ্গার-

উপকরণ-  ৩০০ গ্রাম ফিশ ফিলে (পাঙ্গাস/ কোরাল/ স্যামন/ টুনা ইত্যাদি মাছের কাটাহীন টুকরা),  ১ চা চামচ সরিষা,  ১/২ চা চামচ বেসন, ৩ কোয়া রসুন বাটা,  ৩ চা চামচ রান্নার তেল,  ২টি ডিম,  ১ চা চামচ জিরে,  ১ চা চামচ কালোজিরা,  দেড় চামচ ময়দা,  ১/২ চা চামচ লাল মরিচের গুঁড়া,  ২ কাপ পাউরুটির গুঁড়া,  ১ চামচ লবণ,  ধনে পাতা কুঁচি (পরিমাণ মতো)। 

প্রণালি : ফিশ ফিঙ্গার বানানো কিন্তু খুব কঠিন কাজ নয়। সময়সাপেক্ষও নয়। 

 

–    প্রথমে সব মসলা হালকা পানি দিয়ে পেস্ট তৈরি করুন। এরপর এতে ধনে পাতা কুঁচি, লবণ দিন।

অন্য একটি পাত্রে ডিম ফেটিয়ে নিন। তার সঙ্গে ময়দা মেশান।

মাছের ফিলেগুলো টুকরো করে কেটে নিন। খেয়াল রাখবেন ফিলে কাটার সময় তা যেন সরু হয় (রেডিমেট ফিলে কিনতেই পাওয়া যায়)।

এরপর ফ্রাইং প্যানে তেল গরম করুন। মাছের ফিলেগুলো মিশ্রণে মিশিয়ে নিন। এরপর ফেটানো ডিমের কোট দিয়ে তারপর পাউরুটি গুঁড়া মাখিয়ে সেগুলো ভেজে নিন। আপনার ফিশ ফিঙ্গার তৈরি।

টমেটো সস বা মেয়োনেজের সঙ্গে গরম গরম নাস্তা হিসেবে পরিবেশন করুন। সাথে ১ গ্লাস ফল/ লেবুর শরবত দিতে যেন ভুলবেন না। ব্যাস, তৈরি হয়ে গেলো একটি সুষম নাস্তা। সাধারণত বাচ্চারা ফিশ ফিঙ্গার খুব পছন্দ করে খায়। 

 তবে শিশুরা একই খাবার সাধারণত বারবার খেতে পছন্দ করে না। সে ক্ষেত্রে তাদের একই উপাদানের খাবার নানাভাবে রান্না করে দেওয়া যেতে পারে। যেমন- মাছ পছন্দ না করলে তাদের একটু ভিন্নভাবে যেমন স্যুপ, মাছ ভাজা, মাছের কাটলেট, ফিশ বল, ফিশ ফিঙ্গার, স্যান্ডউইচ ইত্যাদি তৈরি করে দেওয়া যেতে পারে ।

 

ফাহমিদা হাশেম

জ্যেষ্ঠ পুষ্টিবিদ, ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হসপিটাল।

বিনিউজবিডি.ডটকম

আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে সংবাদ পরিবেশনে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নিয়ে “বিনিউজবিডি.ডটকম” বাংলাদেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা, উপজেলা, গ্রামে-গঞ্জে ঘটে যাওয়া দৈনন্দিন ঘটনাবলী যা মানুষের দৃষ্টি ও উপলব্ধিতে নাড়া দেয় এরূপ ঘটনা যেমন, শিক্ষা,স্বাস্থ্য, পরিবেশ, সামাজিক উন্নয়ন, অপরাধ, দুর্ঘটনা ও অন্যান্য যে কোন আলোচিত বিষয়ের দৃষ্টি নন্দন তথ্য চিত্রসহ সংবাদ পাঠিয়ে সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে আত্ম প্রকাশ করুন।

প্রতি মুহুর্তের খবর মুহুর্তেই পাঠকের মাঝে পৌছে দেয়ার লক্ষ্য কাজ করে যাচ্ছে একঝাঁক সাহসী তরুণ সংবাদ কর্মী। এরই ধারাবাহিকতায় স্বল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ সহ দেশের বাহিরে বিভিন্ন দেশে সংবাদদাতা নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।

বিদেশের মাটিতে অবস্থানরত লেখা-লেখিতে আগ্রহী যে কোনো বাংলাদেশীও প্রবাসী নাগরিক “বিনিউজবিডি.ডটকম” এর সংবাদদাতা/প্রতিনিধি হিসেবে আবেদন করতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *