মাছের নানা রোগ-ব্যাধি – bnewsbd.com

স্বাস্থ্য-চিকিৎসা

নিজস্ব প্রতিনিধি, বিনিউজবিডি.ডটকম :

ভোরের ডাক ডেস্ক : দেশে গ্রীষ্ম কিংবা শীতকালে মাছের বিভিন্ন রোগ হয়ে থাকে। এর মধ্যে ক্ষতরোগ, লেজ ও পাখনা পচা, ফুলকা পচা রোগ, উদরফোলা বা শোঁথ রোগ, হিটস্ট্রোক, উকুন হওয়া, অন্ধত্ব এবং হাড় বাঁকা অন্যতম। তবে তুলনামূলকভাবে শীতকালে এসব রোগ বেশি হয়ে থাকে। কারণ এ সময়ে পুকুরের পানি কমে, তাপমাত্রা কমে যায়, মাছ কম খায় এবং পানিতে দূষণের মাত্রা বেড়ে যায়। এতে করে মাছের বৃদ্ধি ও উৎপাদন ব্যাহত হয়। তবে বিশেষ যত্ন ও পরিচর্যা করলে মাছের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মাছের শীতকালীন রোগ ও করণীয়ঃ

শীতের মৌসুমে মাছের রোগের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ক্ষতরোগ। এফানোমাইসেস ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হয়। টাকি, শোল, পুঁটি, বাইন, কই, শিং, মৃগেল, কাতল এবং কার্প জাতীয় বিভিন্ন মাছসহ দেশের প্রায় ৩২ প্রজাতির স্বাদু পানির মাছে এ রোগ হয়ে থাকে। এ রোগ হলে প্রথমে মাছের গায়ে ছোট ছোট লাল দাগ পড়ে; লাল দাগে ঘা ও ক্ষত হয়ে যায়; ক্ষতে চাপ দিলে অনেকসময় দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজও বের হয়; এক পর্যায়ে লেজের অংশ খসে পড়ে; কোন কোন ক্ষেত্রে মাছের চোখ নষ্ট হতে পারে; মাছ ভারসাম্যহীনভাবে পানির ওপরে ভেসে বেড়ায় এবং খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকে; আক্রান্ত মাছ ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে মারা যায়।

এ রোগ প্রতিরোধে শীতের শুরুতে ১৫ থেকে ২০ দিন অন্তর অন্তর পুকুরে প্রতি শতাংশে পুকুরের গভীরতা অনুযায়ী ২০০-৩০০ গ্রাম চুন ও ২০০-৩০০ গ্রাম লবণ আলাদাভাবে প্রয়োগ করতে হবে, পুকুর আগাছামুক্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, জৈবসার প্রয়োগ বন্ধ রাখা; জলাশয়ের পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখা এবং মাছের ঘনত্ব কম রাখতে হবে। পরিশেষে, পুকুরের পানির গুণগতমান উন্নতির দিকে খেয়াল রাখতে হবে। তবে এসব ব্যবস্থা ক্ষতরোগ হওয়ার আগেই নিতে হবে। আর মাছ ক্ষত রোগে আক্রান্তহলে প্রতি কেজি খাদ্য অথবা আটা/ময়দার সাথে ৬০ থেকে ১০০ মিলিগ্রাম অক্সিটেট্রাসাইক্লিন পাউডার মিশিয়ে কাই করে ছোট-ছোট দলা করে পুকুরের চারিদিকে প্রয়োগ করতে হবে। আক্রান্ত মাছ পুকুর থেকে ধরে পুকুর হতে দূরবর্তী স্থানে মাটিতে পুঁতে ফেলা উত্তম।

শীতকালে মাছের লেজ ও পাখনা পচা রোগও দেখা যায়। এ্যারোমোনাসে ওমিক্সো ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হয়ে এ রোগ হয়। কার্প ও ক্যাটফিস জাতীয় মাছে এ রোগ বেশি হয়ে থাকে। তবে রুই, কাতলা, মৃগেলসহ প্রায় সব মাছেরই এ রোগ হতে পারে। এ রোগে আক্রান্ত হলে মাছের পাখনা ও লেজের মাথায় সাদা সাদা দাগ পড়ে যায়, লেজ ও পাখনা পচে খসে পড়া, দেহের পিচ্ছিলতা কমে যাওয়া, দেহের ভারসাম্য হারানো এবং ঝাঁকুনি দিয়ে পানিতে চলাচল করে, মাছের গায়ের বর্ণ ফ্যাকাশে হওয়া, আক্রান্ত মাছ খাদ্য কম খায় এবং আক্রান্ত বেশি হলে মাছ মারা যায়।

ক্ষত রোগের পদ্ধতি অবলম্বন করে এ রোগ প্রতিরোধকরা সম্ভব। রোগ হওয়ার পূর্বেই উলে­খকৃত ব্যবস্থাগুলো নিলে লেজ ও পাখনা পচা রোগ হয় না। পুকুরে মাছের পরিমাণ কমাতে হবে এবং আক্রান্ত মাছ পুকুর থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে।

শীত মৌসুমে ক্ষতরোগ, লেজ ও পাখনা পচার পাশাপাশি ফুলকা পচা রোগও হয়ে থাকে। সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে অধিকাংশ বড় মাছে এ রোগ হয়ে থাকে। তবে সব প্রজাতির পোনা মাছেই এ রোগ হতে পারে। এ রোগ হলে মাছের ফুলকা পচে যায় এবং আক্রান্ত অংশ খসে পড়ে শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হয়, মাছ পানির ওপর ভেসে ওঠে, মাছের ফুলকা ফুলে যায়, ফুলকা থেকে রক্তক্ষরণ হয় এবং আক্রান্ত মারাত্মক হলে মাছ মারা যায়। এ রোগ হলে আক্রান্ত মাছকে শতকরা ২.৫ ভাগ লবণে ধুয়ে আবার পুকুরে ছাড়তে হবে; এক লিটার পানিতে ০.৫ গ্রাম তুঁঁত মিশিয়ে ওই দ্রবণে আক্রান্ত মাছকে এক মিনিট ডুবিয়ে রেখে পুকুরে ছাড়তে হবে এবং পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট বা ডাক্তারি পটাশ ১-২ পিপিএম পরিমান ব্যবহার করা যেতে পারে। 

মাছের নানা রোগ-ব্যাধিএসব রোগের পাশাপাশি শীতের সময় পেট ফোলা বা শোঁথ রোগ হয়ে থাকে। অ্যারোমোনাস নামক ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণে কার্প ও শিং জাতীয় মাছে এ রোগ বেশি হয়। এ রোগ সাধারণত বড় মাছে বেশি হয়। এ রোগ হলে মাছের দেহের ভেতর হলুদ বা সবুজ তরল পদার্থ জমা হয় পেট খুব বেশি ফুলে যায়, দেহের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে, তরল পিচ্ছিল পদার্থ বের হয়, মাছ উল্টা হয়ে পানিতে ভেসে ওঠে, দেহে পিচ্ছিল পদার্থ কমে যায় এবং খাদ্য গ্রহণে অনীহা হয়। এ রোগের প্রতিকারের জন্য প্রতি কেজি খাদ্য অথবা ’আটা/ময়দার সাথে ৬০ থেকে ১০০ মিলিগ্রাম অক্সিটেট্রাসাইক্লিন পাউডার মিশিয়ে কাই করে ছোট-ছোট দলা করে পুকুরের চারিদিকে প্রয়োগ করতে হবে।

এছাড়া পরিচর্যা হিসেবে পানির অক্সিজেন বৃদ্ধির জন্য মটরের সাহায্যে অথবা ব্লোয়ারের মাধ্যমে অথবা সাঁতার কেটে অথবা পানি নাড়াচাড়া করতে হবে এবং ভোর বেলা ২-৩ পিপিএম পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ব্যবহার করা যেতে পারে। পুকুরের পানিতে সরাসরি রোদ পড়ার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে আলো সরবরাহ নিশ্চিত থাকে এবং প্রাকৃতিক উপায়ে অক্সিজেন উৎপাদন হয় এবং প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি হয়। শেওলা, আবর্জনা, কচুরিপানা, আগাছাসহ সব ক্ষতিকর জলজ উদ্ভিদ পরিষ্কার করতে হবে, ১৫ দিন অন্তর অন্তর জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে, পানিতে অ্যামোনিয়া গ্যাস হলে চুন প্রয়োগ করতে হবে, পানি ঘোলা হলে ১ মিটার গভীরতায় ১ শতক পুকুরের পানির পিএইচ উপর নির্ভর করে ২০০-৩০০ গ্রাম চুন প্রয়োগ করতে হবে, পুকুরের পানি কমে গেলে পানি সরবরাহ করতে হবে, পুকুরের পানি বেশি দূষিত হলে পানি পরিবর্তন করতে হবে এবং নিয়মিত পরিমাণমত সুষম খাদ্য প্রয়োগ করতে হবে।

মাছের গ্রীষ্মকালীন রোগ ও করণীয়ঃ প্রাকৃতিক উৎসে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে দিন দিন পুকুরে মাছ চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে। গরমের দিনে মাছ চাষে বেশ কিছু সমস্যা দেখা দেয়। আর এর পেছনে মূল কারণ হলো তাপমাত্রা বৃদ্ধি। বিশেষ করে গ্রীষ্মপ্রধান দেশে সূর্যের প্রখর তাপে জলাশয়ে পানির পরিমাণ কমে যায়। এক্ষেত্রে পানির তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে অনেক সময় মাছ মারা যেতে পারে। কাতলা বা উপরি স্তরের মাছ আগে আক্রান্ত হয়। অগভীর জাতীয় জলাশয়ে মাছ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে।

 

এ পরিস্থিতিতে হররা টেনে পুকুরের তলার গ্যাস বের করে দিতে হবে; ১০০-২০০ গ্রাম চুন এবং ১০০-২০০ গ্রাম লবণ আলাদাভাবে প্রয়োগ করলে রাসায়নিক সমস্যা থেকে সহজেই রেহাই পাওয়া যাবে। এ সময় মাছের খাদ্য গ্রহণে যদি অনীহা দেখা দেয় খাদ্য কমিয়ে দিতে হবে। সম্ভব হলে মোটরের/পা¤েপর মাধ্যমে পানি উপর থেকে পুকুরে ফেলতে হবে। স্থায়ী সমাধান হিসেবে অ্যারেটর সেট করতে হবে। এছাড়াও পুকুরে সেচের মাধ্যমে পানি প্রবেশ করানো যেতে পারে। তবে হররা টানার ক্ষেত্রে পরামর্শ হচ্ছে যেহেতু মাছের অক্সিজেনের স্বল্পতা হতে পারে তাই ওষুধ ব্যবহার থেকে বিরত থকতে হবে।

তীব্র গরমে হিটস্ট্রোকসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে চিংড়ি মারা যায়। পানি স্বল্পতা ও ঘেরে পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশির কারণে চিংড়ি ঘেরে এ মড়ক দেখা  দেয়। এক্ষেত্রে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পানি দিতে হবে এবং পুকুর বা ঘেরে নির্দিষ্ট জায়গায় মাছের আশ্রয়স্থলের ব্যবস্থা করতে হবে যেখানে পানির গভীরতা ৪-৫ ফিট থাকে।

আমাদের দেশের প্রায় মাছেরই উকুন রোগ দেখা দেয়। এর মধ্যে রুই মাছ, কখনো কখনো কাতলা মাছও আক্রান্ত হয়ে থাকে। গ্রীষ্মকালে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। এ রোগে মাছের সারা দেহে উকুন ছড়িয়ে দেহের রস শোষণ করে মাছকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। এতে মাছ ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে মারা যেতে পারে। এ রোগ প্রতিরোধে অবশ্যই পুকুরের পানি আগাছা ও দূষণমুক্ত থাকতে হবে। পাশাপাশি ক্ষত রোধ কারার জন্য পুকুরে ২০০-৩০০ গ্রাম চুন ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া পুকুরে বাঁশের কঞ্চি স্থাপন করেও উকুন প্রতিরোধ করা সম্ভব।

অনেক সময় মাছের পুষ্টির অভাবজনিত রোগ দেখা দেয়। এ রোগে পুকুরে চাষযোগ্য যেকোনো মাছই আক্রান্ত হতে পারে। ভিটামিন এ, ডি এবং কে-এর অভাবে মাছ অন্ধত্ব এবং হাড় বাঁকা রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। মাছের খাবারে আমিষ ও ভিটামিনের ঘাটতি দেখা দিলেও মাছের স্বাভাবিক বর্ধন প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত হয়। অচিরেই মাছ নানা রোগের কবলে পড়ে। এসব রোগে আক্রান্ত মাছকে এক কেজি খাবারের সাথে ৪০ গ্রাম ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের প্রিমিক্স মিশিয়ে খাওয়ানো হলে  যথা শিগগিরই মাছের শারীরিক অবস্থার উন্নতি সম্ভব। মাছের রোগ প্রতিরোধ করার জন্য আমাদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে মাছ চাষ করে চাষকৃত পুকুরে মাছের রোগ প্রতিরোধ করা অনেকাংশেই সম্ভব।

এছাড়া শীত কিংবা গ্রীষ্মকালীনযে কোন রোগ প্রতিরোধের জন্য পুকুরের পরিবেশ ও পানির গুণাগুণ ঠিক রাখা, জলজ আগাছামুক্ত রাখা, পুকুরে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পড়ার ব্যবস্থা করা, অনাকাক্সিক্ষতজলজ প্রাণী অপসারণ করা, অতিরিক্ত কাদা সরানো, দুই তিন বছর পর পর পুকুর শুকানো, নিয়মিত ও পরিমিত চুন প্রয়োগ করা, মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা, প্রাকৃতিক খাদ্যের উপস্থিতি পরীক্ষা করা, হররা টানা, জাল শোধন করে ব্যবহার করা, রোগাক্রান্ত আক্রান্ত মাছ পুকুর থেকে ধরে পুকুর হতে দূরবর্তী স্থানে মাটিতে পুঁতে ফেলা উত্তম , সব সময় ঢেউয়ের ব্যবস্থা রাখা, পানি কমে গেলে পর্যাপ্ত পরিমান পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা, পরিমানমত ভাসমান খাদ্য প্রয়োগ করা এবং পানি বেশি দূষিত হলে পানি পরিবর্তন করা প্রয়োজন।

বিনিউজবিডি.ডটকম

আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে সংবাদ পরিবেশনে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নিয়ে “বিনিউজবিডি.ডটকম” বাংলাদেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা, উপজেলা, গ্রামে-গঞ্জে ঘটে যাওয়া দৈনন্দিন ঘটনাবলী যা মানুষের দৃষ্টি ও উপলব্ধিতে নাড়া দেয় এরূপ ঘটনা যেমন, শিক্ষা,স্বাস্থ্য, পরিবেশ, সামাজিক উন্নয়ন, অপরাধ, দুর্ঘটনা ও অন্যান্য যে কোন আলোচিত বিষয়ের দৃষ্টি নন্দন তথ্য চিত্রসহ সংবাদ পাঠিয়ে সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে আত্ম প্রকাশ করুন।

প্রতি মুহুর্তের খবর মুহুর্তেই পাঠকের মাঝে পৌছে দেয়ার লক্ষ্য কাজ করে যাচ্ছে একঝাঁক সাহসী তরুণ সংবাদ কর্মী। এরই ধারাবাহিকতায় স্বল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ সহ দেশের বাহিরে বিভিন্ন দেশে সংবাদদাতা নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।

বিদেশের মাটিতে অবস্থানরত লেখা-লেখিতে আগ্রহী যে কোনো বাংলাদেশীও প্রবাসী নাগরিক “বিনিউজবিডি.ডটকম” এর সংবাদদাতা/প্রতিনিধি হিসেবে আবেদন করতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *