মাছ খান-রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ান – bnewsbd.com

স্বাস্থ্য-চিকিৎসা

নিজস্ব প্রতিনিধি, বিনিউজবিডি.ডটকম :

ভোরের ডাক ডেস্ক :  শারীরিক সুস্থতার অন্যতম প্রধান শর্ত হচ্ছে পরিমিত পরিমাণ সুষম খাদ্য গ্রহণ। সুষম খাদ্যের বিভিন্ন উপাদানগুলো হলো- প্রোটিন বা আমিষ, কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা, ফ্যাট বা স্নেহ জাতীয়, ভিটামিন, খনিজ উপাদান ও পানি। বর্তমান কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে দেহের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির অন্যতম উপায় হচ্ছে-  পর্যাপ্ত পরিমাণে সুষম খাবার গ্রহণ করা। মাছ ও মৎস্যজাত খাদ্যদ্রব্য এই সুষম খাদ্য চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। 

‘মাছে ভাতে বাঙালি’ এ বিখ্যাত প্রবচনটি খাদ্য হিসেবে মাছের প্রতি আমাদের আকর্ষণ, প্রয়োজনীয়তা ও নির্ভরতার সূচক নির্দেশ করে। মাছ প্রিয় বাঙালি তার পছন্দের রান্নার তালিকায় মাছকে দেয় রাজকীয় মর্যাদা। মাছ শুধু যে খেতেই ভালো তা নয়, এতে রয়েছে বিভিন্ন পুষ্টি ও রোগ-প্রতিরোধকারী উপাদান।

মাছ সহজে শোষণযোগ্য প্রোটিনের একটি অন্যতম প্রাণীজ উৎস। মাছের প্রোটিনকে চর্বিহীন মাংসের সমতুল্য ধরা হয়। মাছে বিদ্যমান এমন কিছু পুষ্টি উপাদানের কথা এখানে বলা হলো যা সমন্বিত উপায়ে দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে ও মজবুত করে তুলতে সহায়তা করতে পারে- 

প্রোটিন বা আমিষ- রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরিতে প্রোটিনের ভূমিকা অন্যতম। দেহের বিভিন্ন ইমিউনোগোবিউলিন (আইজি-এ, আইজি-ই, আইজি-ডি, আইজি-এম) তৈরিতে প্রোটিন প্রয়োজন হয়। দেহে বিদ্যমান  অ্যান্টিবডির মূল উপাদান হলো প্রোটিন। এছাড়াও রক্তে যে শ্বেত কণিকা থাকে সেটি তৈরিতেও প্রোটিন কাজ করে। তাই প্রোটিনকে রোগ-প্রতিরোধকারী উপাদানের মূল ভিত্তি বলা হয়। 

ওমেগা-৩- ফ্যাটি অ্যাসিড-বিশেষ করে Eicosapentaenoic Acid (EPA) and Docosahexaenoic Acid (DHA) অ্যান্টিইনফ্লেমেশনে ভূমিকা রাখে। এগুলো দেহের বিভিন্ন সংক্রমণ প্রতিরোধ ও  ক্ষতস্থান দ্রুত পূরণে সাহায্য করে। তৈলাক্ত মাছ  ও সামুদ্রিক মাছে (স্যামন, টুনা)  ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। আর যেসব মাছের রং সাদা, সেগুলোতেও এসব উপাদান ভালো পরিমাণে থাকে। ইলিশ, রুপচাঁদা ও পাঙাশ মাছে খুব অল্প পরিমাণ ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড পাওয়ার প্রমাণ মেলে। তবে উপকার পেতে চাইলে সপ্তাহে অন্তত দুই টুকরো করে এসব মাছ খেতে হবে।

ভিটামিন ‘এ’- ভিটামিন ‘এ’ ফুসফুস এর ত্বক ও টিস্যুকে সংক্রমণমুক্ত রেখে রেসপিরেটরি বা শ্বাসনালীকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। ভিটামিন ‘এ’ কে অ্যান্টিইনফ্লেমেশন ভিটামিন বলা হয়ে থাকে কারণ এটি সামগ্রিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তৈলাক্ত মাছ ও ছোটো মাছ ভিটামিন ‘এ’ র ভালো উৎস। তবে মলা ও ঢেলা মাছের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ দুটি মাছে ভিটামিন ‘এ’র পরিমাণ খুব বেশি। মনে রাখা প্রয়োজন যে, ছোট মাছের মাথায় বেশির ভাগ ভিটামিন এ পাওয়া যায় তাই কোন অবস্থাতেই মাথা কেটে ফেলে দেওয়া যাবে না। অর্থ্যাৎ ছোট মাছ থেকে পরিমিত ভিটামিন এ পেতে মাছের মাথাসহ খাওয়া চাই। ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ মলা ও ঢেলা মাছ আমাদের দেশের সর্বত্র পাওয়া যায়।

‘বি’ ভিটামিনস- দেহের লোহিত ও শ্বেত রক্তকণিকারা যখন বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেহের অক্সিজেন প্রবাহ ঠিক রাখার চেষ্টা করে তখন বিভিন্ন বি-ভিটামিনস যেমন বি২, বি৬ ও বি১২ এই কাজে সাহায্য করার মাধ্যমে সংক্রমণ প্রতিরোধ করে, দেহের সামগ্রিক রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কার্জকর রাখতে  অন্যতম ভূমিকা রাখে। দেশীয় ছোট মাছ বিশেষ করে মলা মাছে বি ভিটামিনস পাওয়া যায়।

মাছ খান-রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ান

ভিটামিন ডি- ইনেট অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের (যে উপাদান মাইক্রো-অরগানিসমসমূহ ধংস করে) কাজেএ গুরুত্তপূর্ণ ভূমিকা রাখে যা  রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কে কার্যকরি রাখতে সাহায্য করে। সামুদ্রিক মাছগুলোতে ভিটামিন ডি বেশি  পরিমাণে থাকে ।

আয়োডিন- আয়োডিনকে সকল দৈহিক বিপাকের ফুয়েল বলা হয়ে থাকে কারণ, একটি কার্জকরী রোগপ্রতিরোধক ব্যবস্থা নির্ভর করে সঠিক ও সুস্থ বিপাক ক্রিয়ার উপর। আয়োডিন রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতার সঠিক কার্জকারিতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। সামুদ্রিক মাছে ভালো পরিমাণের আয়োডিন থাকে।

জিংক- জিংক  বিভিন্ন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ প্রতিরোধে কাজ করে। এটি দেহের ফ্রন্ট লাইনের কোষগুলোকে  বাইরের জীবাণুগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সর্বদা প্রস্তুত রাখে। দেহের সমস্ত অরগ্যানের ক্ষত পূরণে সাহায্য করার মাধ্যমে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। জিংক আমাদের দেহে সি ত হয় না, তাই প্রতিদিনেরটা  প্রতিদিন নিতে হয়।  দেশীয় ছোট মাছ জিংক এর ভালো উৎস।

সেলেনিয়াম- এটি একধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা দেহে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এর পরিমাণ কমায়। ফলে সংক্রমণ কমে গিয়ে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়। সেলেনিয়াম  অ্যাডাপ্টিভ ও নন-অ্যাডাপ্টিভ  উভয় ধরনের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। 

ক্যালসিয়াম-  গুঁড়া/ছোট মাছের ক্যালসিয়াম  দেহের ইমিউন সেল এর  সিগন্যালিং এ সাহায্য করে  যা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে মজবুত করে। ছোট মাছকে সিদ্ধ করে অন্যান্য শাকসবজির সাথে শিল-পাটায় বা বেøন্ডার মেশিনে পিষে খেলে শরীরের ক্যালসিয়ামের চাহিদা মেটানো যায়। বিশেষ করে যেসব ছোট মাছ মাথা ও কাঁটাসহ খাওয়া হয় সেগুলোকে ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ মাছ বলা হয়। 

আয়রন- আমাদের দেশের অধিকাংশ নারী ও শিশু আয়রনের অভাবজনিত রক্তসল্পতায় ভোগে কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেক পুরুষদের  ক্ষেত্রেও হিমোগ্লোবিনের মাত্রা  কম থাকতে দেখা যায়।  এক্ষেত্রে  দেশীয় ছোট মাছ বিশেষ করে মলা, ঢেলা, দারকিনা ইত্যাদি মাছ আয়রনের ভালো উৎস। এছাড়া কিছু সামুদ্রিক মাছ থেকেও আমরা  আয়রন পেতে পারি যেমন- ইলিশ, টুনা, স্যামন ইত্যাদি যা রক্তস্বল্পতা রোধে ভূমিকা রাখতে পারে। মাছ হচ্ছে প্রানীজ আয়রন এর উৎস অর্থাৎ হিম- আয়রন যার সম্পূর্ণটাই দেহে শোষিত হয়ে কাজে লাগে  যেখানে নন-হিম  আয়রন দেহে আংশিক ব্যবহৃত হয়।  

তাহলে দেখা যাচ্ছে রোগপ্রতিরোধকারী খাবারের ভেতর মাছ অন্যতম। আমাদের দেশে যেসব মাছ আছে, আকার অনুসারে সেগুলোকে মোটামুটি বড়, মাঝারি ও ছোট এ তিন ভাগে ভাগ করা যায়। রুই, কাতলা, আইড়, মৃগেল, বোয়াল, কালিবাউস, পাঙাশ, চিতল, ইলিশ এগুলো বড় মাছের মধ্যে অন্যতম। কই, ফলি, রূপচান্দা, মাগুর, সরপুঁটি, বেলে, শিং- এসব মাছকে মাঝারি আকারের মাছ হিসেবে ধরা হয়। আবার মলা, ঢেলা, কেঁচকি, কাজলি, পুঁটি, টেংরা, চাঁদা, বাতাসি, খলসে এগুলোকে ছোট মাছ বলা হয়। এছাড়া আমাদের দেশের নদী-নালা, খাল-বিল ও পুকুরে আরও অনেক রকমের মাছ পাওয়া যায়।   

জেনে রাখা ভালো, সমপরিমাণের বড় মাছ থেকে দেশীয় ছোট মাছে অধিক পরিমাণে ক্যালসিয়াম, আয়রন ও ভিটামিন এ- সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় অনুপুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। কারণ ছোট মাছ মাথা ও কাটাসমেত খেলেও সাধারণত দেখা যায় আমরা বড় মাছের কাটা খাইনা।

অনেকের অভিযোগ থাকে, বড় মাছ খাওয়ার সামর্থ্য নেই। কিন্তু মনে রাখতে হবে- ছোট মাছ আকারে ছোট হলেও পুষ্টিতে ছোট নয়। পুষ্টিগুণের দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, বড়, মাঝারি বা ছোট মাছে কোনো তফাৎ নেই। বড় মাছের পুষ্টিগুণ যা, ছোট বা মাঝারি আকারের মাছের পুষ্টিগুণও তা। অথচ দামের দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, বড় মাছের দাম এতই চড়া যে তা ক্রয় করা আমাদের অনেকেরই ক্ষমতার বাইরে। তবে তেলাপিয়া, পাঙাশ, কার্ফু, চাপিলা, লইট্টা, পাঁচমিশালি, টাটকিনি,  চান্দা এসব মাছ অনেকটাই সাধ্যের ভেতর আছে। তুলনামূলকভাবে ছোট মাছ দামে অনেক সস্তা। বড় মাছের মতো ছোট মাছেও প্রোটিনের  পরিমাণ বেশি থাকে বলে ছোট মাছও প্রোটিন জাতীয় খাবারের অন্তর্ভুক্ত। প্রতি ১০০ গ্রাম ছোট মাছে প্রোটিনের পরিমাণ হলো ১৪-১৯ ভাগ । 

কাজেই এ কথা বলা যায়, বড় মাছের মতো ছোট মাছও অত্যন্ত পুষ্টিকর ও রোগপ্রতিরোধকারী খাবার। তাই অনেক দামি বড় মাছ না খেতে পারলে আফসোস করার কোনো কারণ নেই। দেহের পুষ্টি সাধন, স্বাস্থ্য রক্ষা ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য বড় মাছের মতো ছোট মাছের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মাছ আমাদের দৈনন্দিন সুষম খাবারের একটি অন্যতম অংশ যা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে সুস্থ ও নীরোগ থাকতে সাহায্য করে। সুতরাং মাছকে সামর্থ্য অনুযায়ী নিত্যদিনের খাবারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করুন।

ফাহমিদা হাশেম

জ্যেষ্ঠ পুষ্টিবিদ, ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হসপিটাল।

বিনিউজবিডি.ডটকম

আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে সংবাদ পরিবেশনে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নিয়ে “বিনিউজবিডি.ডটকম” বাংলাদেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা, উপজেলা, গ্রামে-গঞ্জে ঘটে যাওয়া দৈনন্দিন ঘটনাবলী যা মানুষের দৃষ্টি ও উপলব্ধিতে নাড়া দেয় এরূপ ঘটনা যেমন, শিক্ষা,স্বাস্থ্য, পরিবেশ, সামাজিক উন্নয়ন, অপরাধ, দুর্ঘটনা ও অন্যান্য যে কোন আলোচিত বিষয়ের দৃষ্টি নন্দন তথ্য চিত্রসহ সংবাদ পাঠিয়ে সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে আত্ম প্রকাশ করুন।

প্রতি মুহুর্তের খবর মুহুর্তেই পাঠকের মাঝে পৌছে দেয়ার লক্ষ্য কাজ করে যাচ্ছে একঝাঁক সাহসী তরুণ সংবাদ কর্মী। এরই ধারাবাহিকতায় স্বল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ সহ দেশের বাহিরে বিভিন্ন দেশে সংবাদদাতা নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।

বিদেশের মাটিতে অবস্থানরত লেখা-লেখিতে আগ্রহী যে কোনো বাংলাদেশীও প্রবাসী নাগরিক “বিনিউজবিডি.ডটকম” এর সংবাদদাতা/প্রতিনিধি হিসেবে আবেদন করতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *