প্রতারণার ভয়ে ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’র নির্ভরতা বাড়ছে – bnewsbd.com

অর্থ ও বাণিজ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি, বিনিউজবিডি.ডটকম :

নাজিউর রহমান সোহেল: মো. মামুন হোসেন। দেশের দ্বীপ জেলা ভোলায় থাকেন। মোবাইল এক্সেসরিজ কিনতে ‘অনলাইন মোবাইল শপ’ নামের একটি অনলাইন প্লাটফর্মে যান এবং ম্যাসেঞ্জারে নক দেন। পরে ট্রপিক্যালি উত্তর পান তিনি। এ মাধ্যমে কথা বলেন এবং কি কি পণ্য লাগবে তার তালিকা চান প্রতারকচক্র। আগ্রহী ক্রেতা পণ্যের তালিকা দেন। পরে এই মোবাইল (০১৭৪২১৪৪৭১৬ অথবা ০১৩০১৯৫৬৮৮২) নাম্বারে ১৩৫০ টাকা বিকাশ করার কথা বলে আবির নামের একজন।  আবিরের চাওয়া পুরো টাকা বিকাশ করেন মামুন। ‘অনলাইন মোবাইল শপ’ থেকে বলা হয়, আগামী দুই দিনের মধ্যে তার পণ্য কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বুঝে পাবেন। এজন্য তার নাম ঠিকানাও নেয়া হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে গত বছরের ১৬ মে। 

ভুক্তভোগী মামুন আরও জানিয়েছেন, তিনদিন পর যখন আমার পাার্সেল আসছে না তখন ওই নাম্বারে ফোন করি। আবির নামের ওই লোক বলেন- আপনার পার্সেলটি দিনাজপুরে ভুলে চলে গেছে এবং দু’দিনের মধ্যে পেয়ে যাবেন। এভাবে সে (আবির) ২৫ দিন সময় পার করেছে। পরে আবারও ফোনে ট্রাই করা হলে আমার টাকা ফেরত দেয়া হবে বলে জানিয়ে আমার মোবাইল নাম্বার ব্ল্যাক লিস্টে রাখা হয়। এরপর ওই টাকা আর ফেরত পাননি মামুন।

অনেক নামী অনলাইন শপের বিরুদ্ধেও রয়েছে এই গ্রাহক প্রতারণার অভিযোগ। 

ইমন নামের আরেক ক্রেতা জানালেন, ইভ্যালি অনলাইন শপ থেকে গত ৯ মার্চ ‘কিংস সানফ্লাওয়ার ওয়েল’ অর্ডার করে এখ পর্যন্ত পণ্য বুঝে পাননি তিনি। অথচ এ বাবদ ২ হাজার ১৩৬টাকা ‘ক্যাশ অ্যাডভান্সড’ করতে হয়েছে। যার ইনভয়েস নাম্বার (#ইভিএল-৫৫১৪১১৪৪৯)। এই ক্রেতা বলেন, আামি এখন থেকে ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’ পদ্ধতি ছাড়া অনলাইনে পণ্য ক্রয় করবো না। শাখাওয়াত নামের আরেকজন ভুক্তভোগী জানালেন, কিছুদিন আগে ‘স্মার্ট মোবাইল শপ বিডি’ নামের অনলাইন প্লাটফর্মে ২ হাজার টাকা আগে পাঠিয়ে এখন পর্যন্ত পণ্য পাননি সে। তার কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গেও এমন ঘটনা ঘটেছে।

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন কেনাকাটা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষত করোনা মহামারীর দুঃসময়ে ঘরবন্দি মানুষের প্রয়োজন পূরণে অনলাইন শপগুলোর ভালো ভূমিকা রাখলেও সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে প্রতারণার বিষয়টি। নানাভাবে গ্রাহকদের প্রতারিত করে যাচ্ছে ভূঁইফোড় অনলাইনশপ। 

অরিজিনাল প্রোডাক্টের দাম রেখে রেপ্লিকা ও নকল প্রোডাক্ট গছিয়ে দেয়া হচ্ছে। বাজার মূল্যের তুলনায় বেশি দাম নেয়া হচ্ছে। অফারের প্রলোভন ও ক্যাশব্যাকের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে অযাচিতভাবে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে গ্রাহকের টাকা। ছবিতে দেখানো পণ্যের মানের সঙ্গে ডেলিভারিকৃত পণ্যে মিলও থাকছে না। ক্যাশ অন ডেলিভারির সুযোগও রাখছে না অনেক প্রতিষ্ঠান। যথাসময়ে পণ্য ডেলিভারি না দেয়ারও বিস্তর অভিযোগ আছে অনলাইন শপগুলোর বিরুদ্ধে। 

অন্যদিকে বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই অনলাইনে কেনাকাটায় আগে দাম পরিশোধ করতে হয়; ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশে। অধিক মাত্রায় প্রতারণার ঘটনা ঘটনায় আগে দাম পরিশোধ করে পণ্য কেনার উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন ভোক্তারা। তবে ক্রেডিট কার্ড বা মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে পরিশোধের কিছু ব্যবস্থা থাকলেও তার সংখ্যা খুবই কম। এ অবস্থায় অনলাইন কেনাকাটায় ‘এসক্রো সার্ভিস’ চালুর দাবি জানিয়েছেন ক্রেতারা। 

ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত কয়েকটি কারণে তারা ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’ পছন্দ করেন। এগুলো হলো- পণ্য হাতে পেয়ে পরীক্ষা করে দাম পরিশোধ করা; প্রতারণা থেকে রক্ষা; অচেনা বিক্রেতা বা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ওপর বিশ্বাসহীনতা; অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা; ক্রেডিট কার্ড বা মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার না করা; অনলাইন পেমেন্টে অনভ্যস্ততা ও অনাস্থা; নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদি।

এ বিষয়ে ই-কমার্স এসেসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইক্যাব) এর চেয়ারম্যান (গভারমেন্ট এন্ড পলিসি) রেজওয়ানুল হক জামি ভোরের ডাককে বলেন, ই-কমার্স এ ‘ক্যাশ অ্যাডভান্সড’ পদ্ধতি বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে জনপ্রিয়। বাংলাদেশে এ পদ্ধতিতে প্রতারণার কারণে মূলত আস্থা সংকটে পড়েছে মানুষ। বিশ্বের প্রায় সব ধরনের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোকে পণ্য ডেলিভারির আগে অ্যাডভান্সড পেমেন্ট করতে হয়। তারা বিভিন্ন ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড বা কোনো মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে এটি করে থাকে। সেখানে একজন ভোক্তা অভিযোগ করলে ব্যাংকগুলো অভিযুক্ত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর টাকা আটকে রাখার সুযোগ থাকে। এতে থার্ডপার্টি কোনো ধরনের প্রতারণার সুযোগ পায় না। এটি বাংলাদেশেও চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। 

মিরপুর থেকে অনলাইনে থাই প্রোডাক্ট সরবরাহ করেন মো. ফুয়াদ। ‘থাই প্রোডাক্ট বিডি’র স্বত্তাধিকারী মো. ফুয়াদ জানিয়েছেন, গত দুই বছর ধরে তিনি থাইল্যান্ডের বেশ কিছু পণ্য এনে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অনলাইনে ডেলিভারি দেন। বিশেষ করে চুলপড়া বন্ধে ‘নিউ হেয়ার লোশন’ নামের একটি পণ্যের দাম বাংলাদেশি টাকায় ২১০০ থেকে ২৩০০ পড়ে। বেশির ভাগ ক্রেতাই আগে টাকা পেমেন্ট করতে অনীহা দেখান। সবাই ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’তে ক্রয় করতে চান। এক প্রশ্নের জবাবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ-এমবিএ শেষ করা এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন,  মূলত ই-কমার্স মানেই হচ্ছে- আগে ক্যাশ পেমেন্ট পরে পণ্য ডেলিভারি। পৃথিবীর প্রায় সব দেশে এই নিয়ম। কিন্তু আমাদের দেশে প্রত্যারণার কারণে গ্রাহকরা এতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। তাই ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’ বেশ জনপ্রিয় হয়ে গেছে। অনলাইনের নিয়মিত কেনাকাটা করেন মো. নেকবার হোসেন। অনলাইনে কেনাকাটায় ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’ বা পণ্য হাতে পাওয়ার পর মূল্য পরিশোধ করতে পছন্দ করেন তিনি। 

নেকবার হোসেন জানালেন, এ পদ্ধতিতে সুবিধা হলো, টাকা পরিশোধ করে করে জিনিসটা পাবো, টাকা মার যাবে কিনা, ইত্যাদি দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় না। 

তবে ক্যাশ অন ডেলিভারি’ বিষয়ে সমস্যার কথা জানিয়ে মো. ফুয়াদ বলেন, এক্ষেত্রে দেখা যায় ক্রেতা পণ্য অর্ডার করেছেন ঠিকই কিন্তু সময়মতো ফোন ধরছেন না বা বন্ধ রাখছেন। আবার রেসপন্ডসডও করেন না। সেক্ষেত্রে আমাদের কুরিয়ার ফি বাবদ টাকা গচ্চা দিতে হয়।

ইক্যাব সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহেদ তমাল ভোরের ডাককে বলেন, দেশে ই-কমার্সের জনপ্রিয়তা তৈরি ও প্রতারণা বন্ধে আমরা সরকারকে কতগুলো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা দিয়েছে। বিশেষ করে ই-কমার্সের প্রতারণা ঠেকাতে সারাদেশে ‘এসক্রো সার্ভিস’ বাস্তবায়নের কথা বলেছি।  ইতিমধ্যে বাংলাদেশে ব্যাংক সারাদেশে এ পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই ও ব্যাংক এশিয়া কাজ করছে। আমরা চাই- অনলাইন কেনাকাটায় ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় এবং লেনদেন প্রক্রিয়া স্বচ্ছতা থাকুক।

বিনিউজবিডি.ডটকম

আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে সংবাদ পরিবেশনে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নিয়ে “বিনিউজবিডি.ডটকম” বাংলাদেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা, উপজেলা, গ্রামে-গঞ্জে ঘটে যাওয়া দৈনন্দিন ঘটনাবলী যা মানুষের দৃষ্টি ও উপলব্ধিতে নাড়া দেয় এরূপ ঘটনা যেমন, শিক্ষা,স্বাস্থ্য, পরিবেশ, সামাজিক উন্নয়ন, অপরাধ, দুর্ঘটনা ও অন্যান্য যে কোন আলোচিত বিষয়ের দৃষ্টি নন্দন তথ্য চিত্রসহ সংবাদ পাঠিয়ে সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে আত্ম প্রকাশ করুন।

প্রতি মুহুর্তের খবর মুহুর্তেই পাঠকের মাঝে পৌছে দেয়ার লক্ষ্য কাজ করে যাচ্ছে একঝাঁক সাহসী তরুণ সংবাদ কর্মী। এরই ধারাবাহিকতায় স্বল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ সহ দেশের বাহিরে বিভিন্ন দেশে সংবাদদাতা নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।

বিদেশের মাটিতে অবস্থানরত লেখা-লেখিতে আগ্রহী যে কোনো বাংলাদেশীও প্রবাসী নাগরিক “বিনিউজবিডি.ডটকম” এর সংবাদদাতা/প্রতিনিধি হিসেবে আবেদন করতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *