তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী ইফতার-সাহরি-দানশীলতা – দৈনিক ঢাকার ডাক – bnewsbd.com

প্রবাস

নিজস্ব প্রতিনিধি, বিনিউজবিডি.ডটকম :

সিয়াম সাধনার পবিত্র মাস রমজান। সারা বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা করোনার ভয়াল থাবার মধ্যেও রোজা পালন করছেন। তবে স্থানের পার্থক্যের কারণে কেউ ১১ ঘণ্টায় রোজা শেষ করছে, কেউবা ২২ ঘণ্টাও। তুরস্কে এ বছর ভোর ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৮টা পর্যন্ত প্রায় ১৬ ঘণ্টা রোজা পালন করছে।

রোজার নিয়ম সব দেশের মুসলমানদের জন্য একই রকম হলেও দেশ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস একেক রকম। ভিন্ন ভিন্ন দেশে তাই ইফতার ও সাহরির আয়োজনেও বেশ ভিন্নতা চোখে পড়ে। অটোমান সাম্রাজ্যের দেশ ও ইউরোপের সর্ব বৃহৎ মুসলিম দেশ তুরস্কও তার ব্যতিক্রম নয়।

চালচলনে ইউরোপীয় সংস্কৃতির প্রভাব থাকলেও ধর্মীয় বিষয়গুলোতে তুর্কিরা এখনও রক্ষণশীল। রোজার ইফতার ও সাহরিকে তারা বেশ আন্তরিকভাবেই পালন করে থাকে। এজন্য বেশ বর্ণাঢ্য আয়োজন থাকে তাদের।

রমজান মাসে তুরস্কের পরিবারগুলোর সদস্যরা সবাই একসাথে মিলিত হন। এ মাসে তারা খাবারের জন্য একটু বেশি সময় কাটান। রোজা উপলক্ষে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে দেখা করার যেমন সুযোগ হয়, তেমনি দারুণ মজাদার সব খাবারের স্বাদও নেয়া হয়।

ইফতার:

jagonews24

তুর্কিরা সাধারণত ইফতারে তাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার খেতে পছন্দ করে। সে কারণেই দেশটির ঐতিহ্যবাহী সব খাবার খাওয়ার জন্য রমজান মাসই হলো সবচেয়ে ভালো সময়। সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতারিতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসে ঐতিহ্যবাহী সব খাবার খাওয়া একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। ইফতারের আয়োজন থাকে বেশ জমকালো।

ইফতারের তালিকায় থাকে বিখ্যাত পিডে নামক গরম ও তাজা রুটি (পিঠা), খেজুর, খাবার টেবিলে অবশ্যই থাকবে স্যুপ (সরবা), সালাদ (পাতা কপি, বেগুনী বাঁধা কপি, গাজর, পেঁয়াজ, জালবিহীন সবুজ ও লাল মরিচ, মাইডানোজ, নানে অর্থাৎ পুদিনা পাতা, জয়তুনের তৈল, বিনেগার বা লেবুর রস, কেচাপ, সরিষা, কিবিরজিক ইপরা/মুরাল অথাৎ কোঁকড়ানো পাতা-লেটুস, ললরোসো ইপরা, সেমিজতু, রোকা দেমেত, দেরেওত, কুজু কুলাই), আসলে সালাদ তৈরির জন্য পুদিনা পাতার মতো হরেক রকমের পাতা তথা সবজি রয়েছে। শশা, রোশন ও দই দিয়েও এক ধরনের সালাদ তৈরি করা হয়।

ইফতারে তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী খাবারের ধারাবাহিকতা চলতেই থাকে। তা হলো- ভাত, মাংসের কিমা (বিভিন্ন সবজি দিয়ে রান্না), খোপতে (মিটবল), পাস্তিরমাহ (মসলাই গরুর মাংস), মশলাদার গরুর মাংসের পাতলা স্লাইস, মসলাদার সসেজ, টমেটো ও শশা, কাজু তান্দির বা তন্দুর করা ভেড়ার মাংস, হানকার বেগেন্ডি, মানতি বা তুর্কির বিশেষ প্রক্রিয়ার রান্না করা ডাম্পলিংস।

মুরগি-গরু-ভেড়া-খাসি ইত্যাদির মাংসের সঙ্গে সবজি,ছোলা বুট (নুহুত),সিমের বিচি (পাসুলিয়া) ও হালকা মসলা দিয়ে তৈরি হয় রকমারি খাবার। মাংসসমূহ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের কাবাবও (চিকেনের সাথে সুলতান কাবাব, চিকেন ক্র্যাম্বল কাবাব, শেহজাদে কাবাব, শিশ কাবাব ইত্যাদি) তৈরি করা হয়।

আরও থাকে বিভিন্ন ধরনের শাক (ইসপানাক)। এই সকল খাবারের যে কোনো একটি বা একাধিক ইফতারে থাকে। সঙ্গে থাকে নোনতা স্বাদের দই দিয়ে তৈরি পানীয় আয়রান, শরবত, বিভিন্ন রকম ফলের রস ইত্যাদি।

উল্লেখ্য, ইফতারে স্যুপ ও রুটির পর তুর্কিরা সাধারণত একটি মাংস ও একটি সবজি জাতীয় খাবার রাখেন। এছাড়া ভাত (পিলাভ) বা নুডুলস ধরনের খাবারও থাকে তালিকায়। সব কিছু গরম গরম সরবরাহ করা হয় একটি পর একটি, সব খাবার এক সঙ্গে দেয়া হয় না।

শুধু ইফতারের মধ্যেই তুর্কিদের সন্ধ্যার আয়োজন শেষ হয়ে যায় না। বিভিন্ন ধরনের বাকালাভা তথা মিষ্টি, কুনাফা, জিলাপি (হালকা), হালুয়া, আইসক্রিম, বাদাম, কপি ও চা ইত্যাদি ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে।

সাহরি:

jagonews24

রোজার সাহরিকে তুর্কি ভাষায় বলে ‘সাহুর’। সচরাচর তুরস্কে সকালের নাস্তাটাই সাহরি হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। সুবেহ সাদিকের আগের এই আহারে সাধারণত ভারি খাবার বর্জন করেন তারা। সাহরিতে কম লবণযুক্ত খাবার খান তারা। এতে করে সারাদিন পানির তৃষ্ণা কম পায়।

এ সময় তাদের খাবার টেবিলে থাকে দুধ, ডিম সিদ্ধ-ভাজি কাসার পনির দিয়ে-কিমা (সুজুক) দিয়ে, পিডে নামক গরম ও তাজা রুটি (পিঠা), মধু, মাখন, টমেটো, শশা, সালাদ, সবজি মরিচ (ঝালবিহিন), কালো এবং সবুজ জলপাই (জায়তুন), তার্কিশ সাদা পনির, কাসার পনিরসহ বিভিন্ন ধরনের পনির, কিমা (সুজুক), বোরেক, পিজা (লাহমাজু), ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চকলেট জাতীয় বিভিন্ন ক্রিম এবং আঙ্গুর, বরই (ইরিক) ও এসট্রভরি জাতীয় ইত্যাদি ফলের রেসেলি (জাম), টোস্ট, কেক, মিনি প্যানকেক, বাদাম, কাজু বাদাম, তরমুজসহ বিভিন্ন ধরনের ফল, ফলের রস, চা ইত্যাদি থাকে।

jagonews24

রমজানজুড়েই তুরস্কের মানুষ খেয়ে থাকেন হাতে বানানো পিডে নামক গরম ও তাজা রুটি (পিঠা)। তুরস্কের সব বেকারিই গরম গরম এই রুটি তৈরি করা হয় ইফতার ও সাহরির পূর্বে।

প্রতি বছরের ইফতার ও সাহরির আয়োজন অত্যন্ত চমৎকার হয়। তুর্কিরা সাধারণত মসজিদে, বাহিরে মাঠে ময়দানে এবং বিভিন্ন জামায়াতে ও দাওয়াতে ইফতার করতে বেশি পছন্দ করে। একে অপরকে দাওয়াত দেয়া রুটিংনে পরিণত হয় রমজান মাসে। প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজন একে অপরকে তৈরিকৃত ইফতার সরবরাহ করে থাকে।

গরমকালে অনেকে সাহরিও বাহিরে গ্রহণ করে থাকে। তবে গত বছরের মতো এবারেও ঘরের বাহিরে ইফতার ও সাহরির আয়োজন ভাটা ফেলেছে করোনাভাইরাস। করোনার ভয়াল থাবা খাবারের ওপরও বিস্তার করেছে। তারপরও ঘরোয়া আয়োজনগুলোতে ইফতার ও সাহরি ঠিকই প্রাণবন্ত হয়ে ওঠেছে।

দানশীলতা:

jagonews24

তুরস্কের ধনীরাসহ সব ধরনের ব্যক্তিরাই তাদের নিজ নিজ সামর্থ্য আনুযায়ী নিজে বা বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন শহরে ও আফ্রিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রমজান উপলক্ষে খাদ্য সামগ্রী প্রেরণ করে। অনেকে নগদ অর্থও প্রদান করে থাকে। অন্যান্য মাসের তুলনায় রমজানে অধিক পরিমাণ দান করে থাকে।

অধিকাংশই তাদের জাকাত ও এই মাসেই দিয়ে থাকে। তবে এখানে বড় কোনো জামায়াত করে দেয়া হয় না। অনেকেই অনলাইনে ব্যাংকের মাধ্যমে তাদের বিশ্বস্ত ব্যক্তি অথবা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থাকে দিয়ে দেয়। তারাই প্রয়োজনীয় ব্যক্তিদের কাছে খাদ্য সামগ্রী বা অনুদান পৌঁছে দেয়।

jagonews24

এর মাধ্যমে কে কাকে সাহায্য করেছে তা এক প্রকার লুকায়িতই থাকে। তাতে কেউ কার কাছে খাটো বা ছোট হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। তারা রমজান আসার আগ থেকেই এভাবে প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। উল্লেখ্য, রমজান উপলক্ষ্যে বাজারে কোনো জিনিসর দাম সচরাচর বৃদ্ধি পায় না।

বিনিউজবিডি.ডটকম

আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে সংবাদ পরিবেশনে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নিয়ে “বিনিউজবিডি.ডটকম” বাংলাদেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা, উপজেলা, গ্রামে-গঞ্জে ঘটে যাওয়া দৈনন্দিন ঘটনাবলী যা মানুষের দৃষ্টি ও উপলব্ধিতে নাড়া দেয় এরূপ ঘটনা যেমন, শিক্ষা,স্বাস্থ্য, পরিবেশ, সামাজিক উন্নয়ন, অপরাধ, দুর্ঘটনা ও অন্যান্য যে কোন আলোচিত বিষয়ের দৃষ্টি নন্দন তথ্য চিত্রসহ সংবাদ পাঠিয়ে সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে আত্ম প্রকাশ করুন।

প্রতি মুহুর্তের খবর মুহুর্তেই পাঠকের মাঝে পৌছে দেয়ার লক্ষ্য কাজ করে যাচ্ছে একঝাঁক সাহসী তরুণ সংবাদ কর্মী। এরই ধারাবাহিকতায় স্বল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ সহ দেশের বাহিরে বিভিন্ন দেশে সংবাদদাতা নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।

বিদেশের মাটিতে অবস্থানরত লেখা-লেখিতে আগ্রহী যে কোনো বাংলাদেশীও প্রবাসী নাগরিক “বিনিউজবিডি.ডটকম” এর সংবাদদাতা/প্রতিনিধি হিসেবে আবেদন করতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *