সরকারি হাইস্কুল : শিক্ষক সংকটে মফস্বলে দুর্দশা – bnewsbd.com

শিক্ষা-সংস্কৃতি

নিজস্ব প্রতিনিধি, বিনিউজবিডি.ডটকম :

নাজিউর রহমান সোহেল : ভোলার দৌলতখান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৩টি বিষয়ে শিক্ষকের পদ আছে ১৭টি। এর মধ্যে সাতজন শিক্ষক পাঠদান করলেও বাকি ১০টি পদে কোনো শিক্ষক নেই। 

অন্যদিকে রাজধানীর গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলে শিক্ষক থাকার কথা ৫৩ জন, সেখানে আছেন ৫০জন। সেখানেও শিক্ষক ঘাটতি নিয়ে পাঠদান কার্যক্রম চলছে। শুধু দ্বীপ জেলা ভোলা আর রাজধানীর এই স্কুলই নয়, শিক্ষক সংকটের এমন করুণ দশা সারাদেশেই। বিশেষ করে গণিত, ইংরেজি, বিজ্ঞান ও বিজনেস স্টাডিজের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষক নেই বেশির ভাগ স্কুলে। বাধ্য হয়ে এক বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে অন্য বিষয়ে পাঠদান করাতে হয়। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে- সরকারি স্কুলে প্রায় ৯ বছর আগে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয় চালু করা হয়। কিন্তু ওই পদে এখন পর্যন্ত শিক্ষকের কোনো পদ সৃষ্টি করতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষকদের নামেমাত্র প্রশিক্ষণ দিয়েই অন্য বিষয়ের আগ্রহী শিক্ষক দিয়ে এ বিষয়টি পড়ানো হচ্ছে বলে জানা গেছে। শিক্ষক সংকটের কারণে মফস্বলের প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। যদিও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) কর্মকর্তারা বলছেন, পদ সৃজনের প্রস্তাব অনেক আগেই তারা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন। কিন্তু সেই প্রস্তাব আজও আলোর মুখ দেখেনি।

দৌলতখান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. শাখাওয়াত হোসাইন সোহাগ ভোরের ডাককে বলেন, বাধ্য হয়ে এক বিষয়ের শিক্ষক অন্য বিষয়গুলো পড়াতে হচ্ছে। কিন্তু এতে পাঠদানে অনেক সমস্যা তৈরি হয়। আর আইসিটি বিষয় নিয়ে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হচ্ছে আমাদের। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। সম্প্রতি আমরা শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণে আঞ্চলিক শিক্ষা অফিসের সহযোগিতা চেয়েছি। এখনও পর্যন্ত কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি।

মাউশি সূত্র জানিয়েছে, নতুন জাতীয়করণ নিয়ে দেশে সরকারি হাইস্কুল ৬৮৭টি। এর মধ্যে পুরনো ৩৫১টি। এসব প্রতিষ্ঠানে সহকারী শিক্ষকের পদ আছে সাড়ে ১০ হাজারের বেশি। যার ২ হাজার ৫৫০টিই শূন্য। এসব স্কুলে প্রধান শিক্ষকদের মোট ৩৫২টি পদের মধ্যে শূন্য ২৩৬টি। সহকারী প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য ১০টি। আর সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদ রয়েছে ২ হাজার ১৮০টি। 

জানা গেছে, অবসর, মৃত্যু এবং পদত্যাগের কারণে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শূন্যপদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। শিক্ষক সংকটের আরো দুইটি কারণ হচ্ছে নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত। ২০১২ সাল থেকে কারিকুলাম ও সিলেবাস পরিবর্তনের পর মাধ্যমিক স্তরে ৪টি নতুন বিষয় চালু হয়। 

এগুলো হচ্ছ : তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি), কর্মমুখী শিক্ষা, শারীরিক শিক্ষা, চারু ও কারুকলা। প্রথম দুটি নতুন। এসব সরকারি বিদ্যালয়ে তথ্যপ্রযুক্তিসহ নতুন চালু করা বিষয়ে শিক্ষকের পদই নেই। যদিও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কম্পিউটার পদের শিক্ষকরা বিষয়টি পড়াতে পারছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সর্বশেষ নিয়োগ হয়েছিল ২০১১ সালে। ৯ বছরের বেশি সময় সরকারি হাইস্কুলে শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১২ সালের ১৫ মে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদমর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তায় উন্নীত করেন। ফলে মাউশি আর শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারছে না। নিয়োগের ক্ষমতা যায় বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) হাতে। 

সূত্র জানায়, এরপর থেকে বিসিএস নন ক্যাডার থেকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। তবে বিসিএস নন ক্যাডার থেকে বিষয়ভিত্তিক পর্যাপ্ত  শিক্ষক পাওয়া যায় না। আবার, বিসিএস নন ক্যাডার থেকে যারা শিক্ষক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হন তাদের বেশির ভাগই শিক্ষক পদে না  থেকে অন্য চাকুরিতে যোগদান করে চলে যান। ফলে বছরের পর বছর মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে  শিক্ষক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে মফস্বলের স্কুলগুলোকে।

২১৫৫ সহকারী শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ধীরগতি

জানা যায়, মাধ্যমিক স্কুলে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দিতে ২০১৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে পিএসসি। পরে ২০১৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ওই বছরের ২০ নভেম্বর লিখিত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়। লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেয় ২ লাখ ৩৫ হাজার ২৯৩ জন পরীক্ষার্থী এবং পাস করে ৭ হাজার ২৬১ জন। এতে চূড়ান্ত ফলাফলে মোট ২ হাজার ১৫৫ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। তবে চূড়ান্ত বাছাই হওয়ার পরে বিগত পাঁচ মাসেও এসব চাকরি প্রাত্যাশীরা নিজ নিজ কর্মস্থলে যোগদান করতে পারেনি। 

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, এসব প্রার্থীদের বর্তমানে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুলিশ ভ্যারিফিকেশনের কাজ চলছে। করোনার কারণে কিছুটা ধীরগতি তৈরি হয়েছে। 

অন্যদিকে মাউশি বলছে, নতুন শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে তারা প্রতিনিয়ত মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে।

এদিকে প্রার্থীরা বলছেন, চাকরি পাওয়ার পরেও যোগদানের দীর্ঘ অপেক্ষায় তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। করোনায় অনেকে কষ্টের মধ্যে দিয়ে দিন পার করছেন। এদেরই একজন সহকারী শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত প্রার্থী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, বিগত পাঁচ মাসে আমাদের কোনও পুলিশ যাচাই বা স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়নি। যে কারণে আমরা এখনও আমাদের কর্মস্থলে যোগদান করতে পারছি না। এই দীর্ঘসূত্রিতা আমাদের অনেকের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। কয়েকজন প্রার্থী ভোরের ডাককে বলেন, এমনেতেই আমাদের দেশে চাকরী পাওয়া খুব কঠিন। আবার, যখন চাকরি পাওয়ার পরেও দীর্ঘসময় বেকার থাকতে হয়, তখন এটি আরও বেদনাদায়ক।  

সার্বিক বিষয়ে মাউশির পরিচালক (মাধ্যমিক) প্রফেসর বেলাল হোসাইন ভোরের ডাককে বলেন, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের শূন্যপদ পূরণে উদ্যোগ চলমান রয়েছে। বর্তমানে ২ হাজারের বেশি নিয়োগ কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। পুলিশ ভ্যারিফিকেশন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার কাজটি চলমান থাকায় এসব প্রার্থীদের যোগদানপত্র দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। দ্রুত এ সংকট কেটে যাবে বলে যোগ করেন তিনি। পাশাপাশি প্রধান ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের শূন্যতা পূরণে পদোন্নতির কাজও চলমান রয়েছে। পদোন্নতি হলে সেই সংকটও আমাদের থাকবে না।

বিনিউজবিডি.ডটকম

আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে সংবাদ পরিবেশনে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নিয়ে “বিনিউজবিডি.ডটকম” বাংলাদেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা, উপজেলা, গ্রামে-গঞ্জে ঘটে যাওয়া দৈনন্দিন ঘটনাবলী যা মানুষের দৃষ্টি ও উপলব্ধিতে নাড়া দেয় এরূপ ঘটনা যেমন, শিক্ষা,স্বাস্থ্য, পরিবেশ, সামাজিক উন্নয়ন, অপরাধ, দুর্ঘটনা ও অন্যান্য যে কোন আলোচিত বিষয়ের দৃষ্টি নন্দন তথ্য চিত্রসহ সংবাদ পাঠিয়ে সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে আত্ম প্রকাশ করুন।

প্রতি মুহুর্তের খবর মুহুর্তেই পাঠকের মাঝে পৌছে দেয়ার লক্ষ্য কাজ করে যাচ্ছে একঝাঁক সাহসী তরুণ সংবাদ কর্মী। এরই ধারাবাহিকতায় স্বল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ সহ দেশের বাহিরে বিভিন্ন দেশে সংবাদদাতা নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।

বিদেশের মাটিতে অবস্থানরত লেখা-লেখিতে আগ্রহী যে কোনো বাংলাদেশীও প্রবাসী নাগরিক “বিনিউজবিডি.ডটকম” এর সংবাদদাতা/প্রতিনিধি হিসেবে আবেদন করতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *