পা দিয়ে লিখেই জীবনযুদ্ধে আমিনুল – bnewsbd.com

সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিনিধি, বিনিউজবিডি.ডটকম :

নরসিংদী সংবাদদাতা : আমিনুল ইসলাম। নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার খিদিরপুর ইউনিয়নের মনতলা গ্রামের তার বাড়ী। তার পিতার নাম মফিজ উদ্দিন আফ্রাদ।

জন্মের পর থেকেই শারিরিক প্রতিবন্ধি আমিনুল। তার দুই হাত একেবারে অকেজো, দুই পা ও প্রায় তাই। হাঁটতেও পারেন না তিনি। শুধু মাত্র হাঁটুতে ভর দিয়ে কোন রকমে চলাফেরা তার। কিন্তু এ প্রতিবন্ধকতা থামাতে পারেনি আমিনুলকে।

অদ্যম সাহস আর মনোবল নিয়ে তিনি দুই পায়ে লিখে চালিয়ে গেছেন ছাত্র জীবনে পড়াশুনা। এভাবে আমিনুল তার পঙ্গুত্বকে পরাস্ত করে এসএসসি ও এইচএসসি পাশ করে ২০১৭ সালে বাড়ীর পাশেই একটি কওমি মাদরাসায় শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত হন। এখন রীতিমতো তিনি একজন পরিপূর্ণ শিক্ষক। পায়ে লিখেই তিনি শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে, দীর্ঘ চার বছর ধরে সুনামের সহিদ চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষকতা। উপার্জনের দায়িত্ব নিয়েছেন পরিবারের চার সদস্যের।

জানা যায়, ১৯৮২ সালে নরসিংদীর মনোহরদীর খিদিরপুর ইউনিয়নের মনতলা গ্রামের দরিদ্র কৃষক মফিজ উদ্দিন আফ্রাদ ওরফে কডু মুন্সির ঘরে জন্ম এ আমিনুলের। মফিজ উদ্দিনের দুই ছেলে এক মেয়ের মধ্যে আমিনুল ছিলেন দ্বিতীয়।

 জন্মের পর থেকেই আমিনুলের হাতে এবং পায়ে সমস্যা ছিল। জন্মের তিন মাসের মাথায় আমিনুলকে নিয়ে তার বাবা মা ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে ডাক্তারের পরামর্শ নেন। কিন্তু বাবার আর্থিক অনটনের কারণে তার আর চিকিৎসা করা হয়নি। এ ভাবে বড় হয়ে উঠেন আমিনুল। কিন্তু ছোট সময় থেকে সে ছিল একজন মেধাবি।

মনোহরদী উপজেলায় দু’হাত পঙ্গু আমিনুল শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে কোনো বাধা মনে না করে, মনতলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ২০০০ সালে পায়ে লিখে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রথমে গণমাধ্যমকর্মীদের দৃষ্টি কাড়েন। সেই আমিনুল নিজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অদ্যম সাহস নিয়ে পায়ে লিখে পড়াশোনা এগিয়ে নিয়েছেন।
এরই ধারাবাহিকতায় আমিনুল ২০০৯ সালে খিদিরপুর বহুমুখি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বাণিজ্যিক বিভাগে এসএসসি পরীক্ষা অংশ নিয়ে ২.৪১ পেয়ে পাস করেন এবং কুমিল্লা আকবর আলী খাঁন কারিগরি বাণিজ্যিক কলেজ থেকে ২০১১ সালে বাণিজ্যিক বিভাগে অংশ নিয় জিপিএ ৪.০০ পেয়ে এইচএসসি পাস করেন। কিন্তু বিএ ভর্তি হলেও পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারেননি তিনি।

এতোসব প্রতিবন্ধকতাও তার জীবনের গতি থামাতে পারেনি। ব্যাহতও হয়নি তেমন জীবনের কোনো ছন্দ। হাতের বিকল্প পায়ে লিখে লেখাপড়া শেষ করে পায়ে লিখেই শিক্ষকতা চালিয়ে যাচ্ছেন।

২০১৭ সাল থেকে খিদিরপুর আফজালুল উলুম কওমী মাদ্রাসার বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের শিক্ষক তিনি। বেশ সুনামের সাথেই এ শিক্ষকতা করে যাচ্ছেন। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরাও তার পাঠদানে অনেক মুগ্ধ।

কিন্তু মাদ্রাসা থেকে মাত্র ২ হাজার টাকা মাসিক বেতন, সামান্য একটা প্রতিবন্ধী ভাতার আয়ে স্ত্রী, দু’ছেলেসহ চারজনের সংসার চলানো তা খুবই কঠিন হচ্ছে আমিনুলের। জমাজমি নেই একটুকুও। তার পরও আমিনুলের অস্বচ্ছালতার নি:শ্বাস নেই তার। মহাসৃষ্টিকর্তার কাছে সন্তুষ্ট তিনি। 

সরেজমিন মাদরাসায় গিয়ে দেখা যায়, মুখভর্তি দাড়ি, মাথায় টুপি পরা। পায়ের সাথে দুই হাতও অকেজ হওয়ায় চলার জন্য তিনি হুইল চেয়ার ব্যবহার করতে পারেন না। তাই তিনি মাত্র হাঁটুর ওপরে ভর করে শ্রেণী কক্ষে পায়ের দুই আঙ্গুলের ফাঁকায় চক ধরে বোর্ডে লিখে পাঠদান করছেন শিক্ষার্থীদের। তার পাঠদানেও শিক্ষার্থীরা বেশই খুশি। তার সম্পর্কে জানতে চাইলে মাদরাসার শিক্ষার্থীরা জানান, আমিনুল স্যার অত্যন্ত যত্নসহকারে আমাদের পড়ান। আমার তার পাঠদানে মুগ্ধ।

স্থানীয় এলাকাবাসী আমিনুলের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, আমিনুলের কেবল ভিটা মাটি ছাড়া চাষ করার মতো একটু জমি নেই। আর জমি চাষ করার মতো শারীরিক সক্ষমতাও নেই তার। যার ফলে স্বল্প বেতনের এই শিক্ষকতা এবং প্রতিবন্ধী হিসেবে প্রাপ্ত কার্ডের ভাতার টাকা দিয়েই অতিকষ্ঠে চলে তার সংসার। তার পরও তিনি কারোর কাছে হাত পাতেন না।

আমিনুল জানান, জন্ম থেকেই তার দুই হাত সম্পূর্ণ অচল। দুই পা ও প্রায় তাই। হাঁটুতে ভর দিয়ে খুব কষ্টকরভাবে চলাফেরা করতে হয় তাকে। দুই ছেলে ও স্ত্রীসহ নিয়ে তার পরিবার। তার বড় ছেলে মাহিন (৭) একটি মাদ্রাসায় হেবজ খানার ছাত্র ও ছোট ছেলে শাহিন (৫) এখনো ভর্তি করা হয়নি। পেশা হিসেবে শিক্ষকতা তার পছন্দ। তাই যোগদান করেন বাড়ির পাশেই খিদিরপুর আফজালুল উলুম কওমি মাদরাসায়। সেখানকার মাদরাসার ছাত্রদের তিনি বাংলা, গণিত এবং ইংরেজি পড়ান।

বর্তমানে একটি প্রতিবন্ধী ভাতা ও মাদ্রাসা থেকে প্রদান করা মাসিক ২ হাজার টাকা বেতনে চলে তার সংসার। তবে তিনি অল্প উপার্জনেই সন্তুষ্ট মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি। কিছু টাকা পুঁজি হলে আমিনুল শিক্ষকতার পাশাপাশি ব্যবসা করে তার চার সদস্য পরিবারটিকে সঠিক ভাবে চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেন।

তিনি মনে করেন, মনের অদম্য ইচ্ছা আর স্বনির্ভর হওয়ার দৃঢ় আঙ্খকা থাকলে আল্লাহ অন্যের কাছে হাত না পেতে জীবন চালানোর তাওফিক দেন এবং আল্লাহই মানুষকে রিজিক দান করেন ।

খিদিরপুর আফজালুল উলুম কওমি মাদরাসার প্রধান আব্দুল বাতেন কুদুরী বলেন, আমিনুলের পাঠদানের ওপর আমরা সন্তুষ্ট। তিনি ইংরেজিতে বেশ পারদর্শী। তাছাড়া অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরাও তার পাঠদানে অনেক খুশি।
নরসিংদী সুইড বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জসিম উদ্দিন সরকার বললেন, আমিনুলের যে অদম্য ইচ্ছা শক্তি রয়েছে সত্যই তা প্রশংসনিয়। বর্তমানে একটা প্রতিবন্ধী ভাতা ও মাদ্রাসার যৎসামান্য বেতনে স্ত্রী, দু’ছেলেসহ চারজনের সংসার চলা খুবই কঠিন হয়ে পরছে তার। এ অবস্থায় আমিনুলের পরিবারটিকে বাঁচাতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলসহ সমাজের দানশীল ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই।

বিনিউজবিডি.ডটকম

আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে সংবাদ পরিবেশনে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নিয়ে “বিনিউজবিডি.ডটকম” বাংলাদেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা, উপজেলা, গ্রামে-গঞ্জে ঘটে যাওয়া দৈনন্দিন ঘটনাবলী যা মানুষের দৃষ্টি ও উপলব্ধিতে নাড়া দেয় এরূপ ঘটনা যেমন, শিক্ষা,স্বাস্থ্য, পরিবেশ, সামাজিক উন্নয়ন, অপরাধ, দুর্ঘটনা ও অন্যান্য যে কোন আলোচিত বিষয়ের দৃষ্টি নন্দন তথ্য চিত্রসহ সংবাদ পাঠিয়ে সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে আত্ম প্রকাশ করুন।

প্রতি মুহুর্তের খবর মুহুর্তেই পাঠকের মাঝে পৌছে দেয়ার লক্ষ্য কাজ করে যাচ্ছে একঝাঁক সাহসী তরুণ সংবাদ কর্মী। এরই ধারাবাহিকতায় স্বল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ সহ দেশের বাহিরে বিভিন্ন দেশে সংবাদদাতা নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।

বিদেশের মাটিতে অবস্থানরত লেখা-লেখিতে আগ্রহী যে কোনো বাংলাদেশীও প্রবাসী নাগরিক “বিনিউজবিডি.ডটকম” এর সংবাদদাতা/প্রতিনিধি হিসেবে আবেদন করতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *