বড্ড ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন সুমনদা – bnewsbd.com

স্বাস্থ্য-চিকিৎসা

নিজস্ব প্রতিনিধি, বিনিউজবিডি.ডটকম :

১৯৭৩ সাল। কলকাতা। গঙ্গার ধারে মশলামুড়ি খাচ্ছেন কবীর সুমন। বিকেল সম্ভবত। পাঁচ-ছয় বছরের এক ছেলে এল। খালি গা। ঢিলে হাফপ্যান্ট হাঁটুর নিচ অবধি ঝুলছে। নোংরা শরীরে যতখানি বিনয়, তার চেয়ে বেশি অসহায়ত্ব। বলল, ‘বাবু ঠোঙাটা ফেলো না, ওটা আমি চাটব।’

কবীর সুমন লিখলেন—
‘খিদের কিন্তু সীমান্ত নেই, নেই চিতা নেই কবরটাও
যুদ্ধটাকেই চিতায় তোলো, যুদ্ধটাকেই কবর দাও
…’

দুই.

এর ঠিক বারো বছর পর ১৯৮৫ সালের ঘটনা। স্থান নিকারাগুয়া। মানাগুয়া শহরের পথে পথে হেঁটে বেড়াচ্ছেন কবীর সুমন। ‘তোমাকে চাই’ দিয়ে বাংলা গানের শরীর–মন পাল্টে দেওয়ার ঘটনা কিন্তু ঘটবে আরও সাত বছর পর। নিকারাগুয়া তখনো বয়ে বেড়াচ্ছে যুদ্ধের ক্ষত। এক শ বছরের বঞ্চনার ক্ষত নিকারাগুয়ার শরীরে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক কর্তৃত্বের ইতিহাস পাল্টে দিয়ে তরুণ বিপ্লবীরা, তথা সমগ্র কৃষক শ্রেণি স্বৈরশাসনের পতন ঘটিয়েছে এর বছর ছয়েক আগে।

কবীর সুমন যখন মানাগুয়ার গলি ধরে হাঁটছেন, তত দিনে বিগত শাসনের রেখে যাওয়া দারিদ্র্য, আর ধ্বংসাবশেষ একটু করে সেরে উঠছে। এক কিশোর বাতিল চাকা চালিয়ে খেলছে রাস্তায়। সুমন জিজ্ঞেস করলেন—তোমার দেশে একটা বিপ্লব হয়েছে, তুমি জানো?

‘হ্যাঁ।’
‘বিপ্লব কী?’
কিশোরটি ভাবল মুহূর্ত কয়েক। পবিত্র ভূমিতে পায়ের বুড়ো আঙুল ঘষতে ঘষতে বলল—সোই লা রেভোলুসিয়ন (আমিই বিপ্লব)।

‘আগুন দেখেছি আমি কত জানলায়
কত জানলার কাছে কাতারে কাতার
জমেছে মানুষ, দাবি গরাদ ভাঙার…’

কবীর সুমনের হাসপাতালে ভর্তির খবর সবার বুকেই একটা ধুকপুকানি তৈরি করেছিল। ছবি: ফেসবুকের সৌজন্যে তিন.

সাল ২০০৭। এবারের স্থান নন্দীগ্রাম। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ইচ্ছা সেখানে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার। তার জন্য জমি দরকার। যেহেতু মসনদে উঠলে সমগ্র জমিন শাসনযন্ত্রের নিজস্ব উঠোন হয়ে যায়, ফলে তারা চাইল কৃষকদের জমি অধিগ্রহণ করতে। রুখে দাঁড়াল কৃষক, নিরন্ন, অসহায় মানুষ। যারা শাসকের কাছে কেবলই ভোট, কেবলই সংখ্যা। শাসক দল জোট বেঁধে প্রকাশ্যে তাদের খুন করল, গুম করল, ধর্ষণ করল। সঙ্গে অন্য দলগুলো ঢুকে পড়ল, যে যার মতো আখের গোছাতে। প্রতিবাদে শামিল কবীর সুমন। কলকাতা থেকে ৭০ মাইল দূরে; নন্দীগ্রাম।

এক কৃষকের বাড়ির উঠোনে বসে কথা বলছেন। শ্রোতার সারি থেকে একজন প্রবীণ এলেন। সাদা টুপি। সাদা দাঁড়ি। দীর্ঘদেহী। বললেন, ‘আমায় নামাজ পড়তে যেতে হবে। বেশি সময় নেই। শুনুন, আমি বেঁচে থাকলে আপনি ভাত পাবেন। তাই চাল–ডাল পাঠাবেন না আমাদের। একখানা এসএলআর (সেলফ লোডিং রাইফেল) দিন।’

‘আমি বেঁচে থাকলে আপনি ভাত পাবেন’—এই একটি বাক্য কবীর সুমনকে ভাবিয়েছিল বহুদিন, এখনো ভাবায়। এমন কত মুহূর্ত, কত মানুষ, কত হাহাকার তাঁর মাথার ভেতর খোদাই হয়ে আছে! তারপর ওই উত্তাল সময়ে একটি টিভি অনুষ্ঠানে তিনি বলছেন, ‘মাননীয় বন্ধুরা, আমি দীর্ঘকাল সাংবাদিকতা করেছিলাম। মাঝে বছর দশেক ভুল করে, পথ ভুল করে গানটাকে পেশা করেছিলাম। তার জন্য পচতেছি, পচতেছি, পচতেছি…’

কবীর সুমনের এই আক্ষেপের শানে–নুজুল আমরা জানি। এসব লিখতে, মগজে রাখতে আমাদের ঘেন্না হয়। যে সমাজে সুমন জন্ম নিচ্ছেন এবং বেড়ে উঠছেন; সেখানেই তিনি দিনের পর দিন হয়েছেন অপমানিত-অপদস্থ। পরপর গানের শো বন্ধ হয়ে যায়। বাড়িতে টেলিফোনে আসে হুমকি ও গালাগাল। কথিত প্রগতিশীল পত্রিকাগুলো তার নামে ছাপায় ব্যঙ্গচিত্র ও মিথ্যের ফুলঝুরি।

অপরাধ?

তিনি খবরের কাগজ থেকে গান পেড়ে আনেন। চিকিৎসকের অবহেলায় যখন হাসপাতালে ছোট্ট পাপড়ি মারা যায়, তখন লেখেন—

‘পাপড়িটা বড় বোকা, হাসপাতালের যন্ত্র
খারাপ হয়েছে হোক না, দেখবি বাঁচবেই গণতন্ত্র’

যখন অনীতা দেওয়ানকে দিনে দুপুরে গণধর্ষণ করা হয় এবং বিচার নিয়ে চলে প্রহসন, কেবল কবীর সুমনই লেখেন তখন—

‘অনীতা দেওয়ান ক্ষমা করো, বড় বেকুবের মতো
গান গাইছি আমি আর কিছু পারি না বলে

কানোরিয়া শ্রমিক আন্দোলনে তাঁকে দেখা যায়। তাঁকে দেখা যায় সিঙ্গুরে; বিদ্রোহী জনতার মাঝখানে।

চার.

অপরাধই বটে!

শিল্পী কেন হিপোক্রেট হবেন না? কেন হবেন তিনি ‘রাজনৈতিক’? কেন ঠান্ডা ঘরে বসে মদের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বাজাবেন না ততধিক ঠান্ডা কোনো সুর, নিটোল প্রেমের? মহা অপরাধ!

ফলে আমরা, যারা নব্বইজুড়ে বেঁচে ছিলাম, এখনো আছি—তারা কতিপয়, এবং দেখা যায়, এই ‘কতিপয়’ও নেহাত কম নয়; তারা এই ‘অপরাধী’কে ভালোবাসি। এবং এই দুঃসময়ে, চরম আদর্শিক দীনতার দিনে, একটা গর্ব অন্তত করতে পারি—‘আমরা বেঁচে আছি কবীর সুমনের সময়ে’।

বাহাত্তর পেরিয়ে তিনি মাস তিনেক আগেই পা রেখেছেন তিয়াত্তরে। এখনো তিনি একই, অবিকল। অথচ কতজনই তো চোখের সামনে পাল্টে নিল নিজস্ব রং; শিবির; এককালে যারা মানুষের ছিলেন।

তিন মাস আগে তিয়াত্তরে পা রাখা কবীর সুমন এখনো প্রাণপ্রাচুর্যে অবিকল। ছবি: ফেসবুকের সৌজন্যে পাঁচ.

এবারের লড়াইটাও খুব ভালোভাবে লড়লেন কবীর সুমন।

দু–বাংলায় যারা সুমনের গান শোনেন, ঘুণাক্ষরেও পছন্দ করেন বা করতেন কোনো এক সময়ে; দিনকয়েক আগে তাঁরা খানিকটা দুলে উঠেছিলেন। ২৮ জুন রাতে হঠাৎ খবর আসে—কবীর সুমন হাসপাতালে ভর্তি। ৭২ বছরের একটা মানুষ, এই করোনা পরিস্থিতির মধ্যে, চারদিক থেকে যখন কেবল নিখোঁজ সংবাদ ভেসে আসছে; কবীর সুমনের হাসপাতাল ভর্তির খবরটা তাই অনেকগুণ উদ্বেগের হয়ে ধরা দিয়েছিল।

তবে হাসপাতালের বেড তাঁকে বেশিক্ষণ শুইয়ে রাখতে পারেনি। একদিনের মাথায় সুমন মেরুদণ্ড তুলে উঠে বসেছেন। সবার সঙ্গে গলা মিলিয়ে হেসেছেন। একটা প্রসঙ্গ টেনে অনেকক্ষণ ধরে গল্প করেছেন। ব্যবস্থাপত্রের সব জটিল টার্মকে থোড়াই কেয়ার করে গানওয়ালা কণ্ঠে তুলেছেন রাগ হংসধ্বনি।

ভক্তদের তাবৎ উৎকণ্ঠায় জল ছিটিয়ে হাসপাতাল থেকে এরই মধ্যে ছাড়া পেয়েছেন গানওয়ালা। তারপর ফিরেছেন কাজে, নিজের মতো করে। আগেই সে ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছিলেন ফেসবুক স্ট্যাটাসে—‘ছেড়ে দিলেই বাড়ি চলে যাব। ফিরে যাব বাংলা খেয়াল অনুশীলন, রচনা ও শেখানোয়। সেটাই আমার বাকি জীবনের কাজ, ব্রত।’

সেটাই হোক। বাংলা গান আরও বহুদিন পাশে পাক তাঁকে। তবে এবার কিন্তু বড্ড ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন সুমনদা!

বিনিউজবিডি.ডটকম

আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে সংবাদ পরিবেশনে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নিয়ে “বিনিউজবিডি.ডটকম” বাংলাদেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা, উপজেলা, গ্রামে-গঞ্জে ঘটে যাওয়া দৈনন্দিন ঘটনাবলী যা মানুষের দৃষ্টি ও উপলব্ধিতে নাড়া দেয় এরূপ ঘটনা যেমন, শিক্ষা,স্বাস্থ্য, পরিবেশ, সামাজিক উন্নয়ন, অপরাধ, দুর্ঘটনা ও অন্যান্য যে কোন আলোচিত বিষয়ের দৃষ্টি নন্দন তথ্য চিত্রসহ সংবাদ পাঠিয়ে সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে আত্ম প্রকাশ করুন।

প্রতি মুহুর্তের খবর মুহুর্তেই পাঠকের মাঝে পৌছে দেয়ার লক্ষ্য কাজ করে যাচ্ছে একঝাঁক সাহসী তরুণ সংবাদ কর্মী। এরই ধারাবাহিকতায় স্বল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ সহ দেশের বাহিরে বিভিন্ন দেশে সংবাদদাতা নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।

বিদেশের মাটিতে অবস্থানরত লেখা-লেখিতে আগ্রহী যে কোনো বাংলাদেশীও প্রবাসী নাগরিক “বিনিউজবিডি.ডটকম” এর সংবাদদাতা/প্রতিনিধি হিসেবে আবেদন করতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *