উপহাসের বিষে প্রাণ গেল কিশোরের – bnewsbd.com

বিচিত্র বিশ্ব

নিজস্ব প্রতিনিধি, বিনিউজবিডি.ডটকম :

‘তুই তো মোটকা। দৌড়াবি ক্যামনে। হাঁটতেই পারোস না। আই আমার সামনে হাঁট।’ ফুটবল দলে নাম লেখাতে গেলে এভাবে উপহাস করেন ক্রীড়াশিক্ষক। এরপর ছাত্রদের দিয়ে টেবিল সরিয়ে জায়গা তৈরি করেন। সেখানে কয়েক চক্কর হাঁটান। সেটা দেখে সহপাঠীরা মটকু বলে উল্লাসে ফেটে পড়ে। বনশ্রীর বাসিন্দা স্কুলশিক্ষক নুরুন্নাহার করিম রুবি এভাবে বলতে বলতেই থেমে যান। তাঁর গলা ধরে আসে, বুকে সন্তান হারানোর বেদনা।

রুবির একমাত্র ছেলে আজওয়াদ আহনাফ করিম সামিন বনশ্রী আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্র ছিল। শিক্ষক ও সহপাঠীদের কটূক্তিতে ত্যক্তবিরক্ত এই কিশোর একসময় খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দেয় ওজন কমাবে বলে। এতে সে অ্যানোরেক্সিয়া নারভোসা রোগে আক্রান্ত হয়। অবস্থা খারাপ দেখে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর ২৬ জুন সবাইকে কাঁদিয়ে চলে যায় পরপারে, যেখান থেকে আর কোনো দিন তাকে কটূক্তি শুনতে হবে না।

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সামিনের বাসায় গিয়ে দেখা গেল বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির বই আর পুরস্কারের স্মারকে সাজানো সামিনের ঘর। ক্লাসে প্রথম হওয়ায় পুরস্কারের স্মারক। অঙ্কনের পুরস্কার। চারপাশে দুরন্তপনার ছাপ। স্কুলের ডিবেটিং ক্লাব, ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাবের সদস্য। খেলাধুলার প্রতি দারুণ ঝোঁক ছিল সামিনের।

মেধাবী আর কিছুটা দুরন্ত সামিন কীভাবে বদলে গেল, সে কথাই বলছিলেন মা রুবি। বললেন, ‘আমার এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলেটা খেতে পছন্দ করত। পরিবারের সবার ছোট হওয়ায় আদর করে সবাই খাওয়াত। সিক্সে ওঠার পর ওজন বাড়তে থাকে। ক্লাস এইটে উঠলে ওজন হয়ে যায় ৯৩ কেজি। এরপর হঠাৎ করে আমাদের সঙ্গে খাওয়া বন্ধ করে দেয়। নিজের কম্পিউটার টেবিলে খেত। ব্যায়াম করতে থাকে। গত ডিসেম্বরে তার ওজন নেমে আসে ৬০ কেজিতে। আমরা ভাবছিলাম, ব্যায়াম করে ওজন কমাচ্ছে। কিছুদিন পর দেখি পায়ে পানি জমে গেছে। তখন বুঝতে পারি, ভয়ানক কোনো রোগে ধরেছে তাকে। যখন জানতে পারলাম তখন আর কিছু করার নেই। তত দিনে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে। ওজন দ্রুত কমে যাচ্ছিল। মারা যাওয়ার সময় তার ওজন ছিল ৩৬ কেজি। চিকিৎসকেরা বলছেন, ছেলে অ্যানোরেক্সিয়া নারভোসা রোগে ভুগছে।’ 

সামিনের বাবা ফজলুল করিম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য একটু ভালো হওয়ায় ছেলেটা সবার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখত। কোচিংয়ে যেতে আপত্তি করত না। কিন্তু ক্লাস এইটে উঠে হঠাৎ স্কুলে যেতে চাইত না। পরে জানতে পারছি, শিক্ষকদের কাছে অপমানিত হওয়ার পর সহপাঠীরাও তাকে পেছন থেকে এসে মারত। স্বাস্থ্য ভালো ছিল বলে মেরে আরাম পেত। স্কুলের বাথরুমে একবার আটকে রেখে সহপাঠীরা মারধর করেছিল। এই অপমান আর উপহাস সহ্য করতে না পেরে ছেলেটি না খেয়ে ওজন কমাতে শুরু করে। স্বামী-স্ত্রী দুজন ব্যস্ত থাকায় শুরুতে বিষয়টা বুঝতে পারিনি। যখন বুঝলাম তখন দেরি হয়ে গেছে।’

সামিনের বড় বোন সুমায়তা এখন একা। একমাত্র ভাইকে হারিয়ে দিনরাত এ–ঘর ও–ঘর করে। বলল, ‘সামিন গোপনে খাবার ফেলে দিত। আবার জোর করে খাওয়ালে আড়ালে গিয়ে বমি করত। বেড়াতে খুব পছন্দ করত সে। বসে বসে ভ্রমণের ভিডিও দেখত।’

রুবির পরিবারের এই অভিযোগ নিয়ে কথা বলেন বনশ্রী আইডিয়াল উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোয়াজ্জেম হোসেন। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে লিখিত বা মৌখিক কোনো অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেব।’

বুলিংয়ের বিরুদ্ধে স্কুলে অভিযোগ না দেওয়ার ব্যাপারে সামিনের বাবা ফজলুল করিম বলেন, ‘ছেলে ভয়ে আমাদের কিছু জানায়নি। অভিযোগ দিলে যদি আরও বুলিংয়ের শিকার হয়। আর আমরাও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে চাইনি। আমি চাই, আর কারও সন্তান যেন এ রকম বুলিংয়ের শিকার না হয়। আমার মতো কেউ যেন সন্তানহারা না হয়।’

কিশোরদের বুলিং নিয়ে আজকের পত্রিকার পক্ষ থেকে কথা হয় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ফারজানা রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর সব বাচ্চা মোটা, কালো বা খাটো হওয়া নিয়ে বুলিংয়ের শিকার হয়। যাদের সঙ্গে তারা মিশতে চায়, তারাও বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করে উপহাস করে। বন্ধুদের কাছেও তারা হাসিঠাট্টার পাত্র হয়। সামিনের ক্ষেত্রে হয়তো সেটাই ঘটেছিল। বাধ্য হয়েই সে দিনের পর দিন না খেয়ে থেকেছে। এ ক্ষেত্রে প্রথম দরকার মা–বাবার সঙ্গে বাচ্চাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। যেখানে যা ঘটুক না কেন, সেটা যেন মা–বাবার কাছে তারা নির্ভয়ে বলতে পারে। একটা শিশু–কিশোরের ভালোভাবে বেড়ে ওঠার জন্য এটা খুবই জরুরি।’ 

বিনিউজবিডি.ডটকম

আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে সংবাদ পরিবেশনে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নিয়ে “বিনিউজবিডি.ডটকম” বাংলাদেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা, উপজেলা, গ্রামে-গঞ্জে ঘটে যাওয়া দৈনন্দিন ঘটনাবলী যা মানুষের দৃষ্টি ও উপলব্ধিতে নাড়া দেয় এরূপ ঘটনা যেমন, শিক্ষা,স্বাস্থ্য, পরিবেশ, সামাজিক উন্নয়ন, অপরাধ, দুর্ঘটনা ও অন্যান্য যে কোন আলোচিত বিষয়ের দৃষ্টি নন্দন তথ্য চিত্রসহ সংবাদ পাঠিয়ে সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে আত্ম প্রকাশ করুন।

প্রতি মুহুর্তের খবর মুহুর্তেই পাঠকের মাঝে পৌছে দেয়ার লক্ষ্য কাজ করে যাচ্ছে একঝাঁক সাহসী তরুণ সংবাদ কর্মী। এরই ধারাবাহিকতায় স্বল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ সহ দেশের বাহিরে বিভিন্ন দেশে সংবাদদাতা নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।

বিদেশের মাটিতে অবস্থানরত লেখা-লেখিতে আগ্রহী যে কোনো বাংলাদেশীও প্রবাসী নাগরিক “বিনিউজবিডি.ডটকম” এর সংবাদদাতা/প্রতিনিধি হিসেবে আবেদন করতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *